ফোর-জি যুগে বাংলাদেশ: প্রভাব পড়বে জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে

জেসমিন পাপড়ি
2018.02.21
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে মুঠোফোন অপারেটর রবি সারা দেশে ফোর-জি সেবা চালুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে মুঠোফোন অপারেটর রবি সারা দেশে ফোর-জি সেবা চালুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
বেনারনিউজ

অবশেষে চতুর্থ প্রজন্মের টেলিযোগাযোগ সেবা বা ফোর-জি যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। গত মঙ্গলবার থেকে ইন্টারনেটে দ্রুতগতির সেবার সর্বশেষ এই প্রযুক্তির সুবিধা পেতে শুরু করেছেন গ্রাহকেরা।

তবে এই সেবার পূর্ণাঙ্গ বিস্তারে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন মুঠোফোন অপারেটরেরা। অপারেটররা বলছেন, ফোর-জি ইন্টারনেটের গতি থ্রি-জির তুলনায় কমপক্ষে দ্বিগুণ হবে।

২০০৯ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়া ফোর-জি সেবা বাংলাদেশে আসল আট বছর পরে। এর আগের প্রযুক্তি ছিল টু এবং থ্রি-জি।

টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ফোর জি উপযোগী অবকাঠামো ও মোবাইল ফোন বা স্মার্টফোনের কম থাকায় মোবাইল গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এ সেবার বাইরে থেকে যাবে। তবে ফোর জি সেবা পুরোপুরি চালু হলে তা ব্যবসা–বাণিজ্য ও জীবনযাত্রাসহ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে তাঁদের মত।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বেনারকে বলেন, “ফোর-জিতে প্রবেশের ফলে অপারেটরেরা গ্রাহকদের আরও উত্তম সেবা দিতে পারবে। উন্নত ও সাশ্রয়ী এই প্রযুক্তির ফলে ইন্টারনেটের দামও কমে আসবে, দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে।”

এর আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোর-জি তরঙ্গের নিলামের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

“অপারেটররা এত দিন গ্রাহক বাড়ালেও তরঙ্গ বাড়াচ্ছিল না। কিন্তু এখন আমরা তরঙ্গ দিয়েছি, সেই সঙ্গে তরঙ্গের প্রযুক্তি নিরপেক্ষতার সুবিধাও দিয়েছি। তাই এখন থেকে গ্রাহকদের মোবাইল সেবার মানের বিষয়ে অপারেটরদের ছাড় দেওয়া হবে না,” বেনারকে বলেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। যদিও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়ে সরকারের এমন হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে বিশ্বব্যাংক ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলছে, ইন্টারনেট-বঞ্চিত একক জনগোষ্ঠীর দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পাঁচ নম্বর। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৯২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট সেবাবঞ্চিত বলে জানায় বিশ্বব্যাংক।

এখনই ফোর-জি’র আওতায় নয় সব গ্রাহক

অপারেটরদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মোবাইল ফোনসেটের মাত্র ৩০ শতাংশ স্মার্টফোন। যেগুলোর মধ্যে ফোর-জি প্রযুক্তির সুবিধা রয়েছে ১০ শতাংশের কম স্মার্টফোনে। তা ছাড়া মোবাইল অপারেটররাও একসঙ্গে সারা দেশে এই সুবিধা দিতে পারছে না।

ফলে এখনই ফোর-জি’র আওতায় আসছে না দেশের সকল মোবাইল গ্রাহক। এ ছাড়া প্রশ্ন রয়েছে ইন্টারনেটের গতি নিয়েও।

“দেশে এখনো এই প্রযুক্তির উপযোগী হ্যান্ডসেট ও ব্যান্ডউইথ সরবরাহ অবকাঠামোয় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এ কারণেই শুরুতে সকল গ্রাহক এখনই ফোর-জি সেবা নিতে পারবে না,” বেনারকে বলেন মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবীর।

মঙ্গলবার ফোর-জি লাইসেন্স পাওয়ার পরপরই প্রাথমিকভাবে ৮০টি সাইট বা মোবাইল টাওয়ারে এই সেবা চালু করেছে গ্রামীণফোন। অপর দুই অপারেটর রবি ঢাকাসহ দেশে ১৭৯টি সাইট বা মোবাইল টাওয়ারে এবং বাংলালিংক প্রাথমিকভাবে ২০০-এর বেশি সাইটে ফোর-জি সেবা চালু করেছে।

এমন অবস্থায় বড় বড় শহরের গ্রাহকেরা ফোর-জি সুবিধা পেলেও দেশের প্রত্যন্ত এলাকার গ্রাহকেরা বঞ্চিত হবে বলে মনে করেন নুরুল কবীর।

তবে ধীরে ধীরে সারা দেশেই ফোর-জি সুবিধা চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন অপারেটররা।

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ বেনারকে বলেন, নতুন তরঙ্গ কেনার পর গ্রামীণফোনের বর্তমান তরঙ্গ ৩৭ মেগাহার্টজ আর বাংলালিংকের ৩০.৬ মেগাহার্টজ। তবে রবির আগে থেকেই ৩৬.৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ থাকায় তারা নতুন তরঙ্গ কেনেনি। সেটা দিয়েও থ্রি-জি সেবায় তারা সর্বোচ্চ ৫ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেটের সেবা দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “এখন ফোর-জির জন্য নির্ধারিত গতি ২০ এমবিপিএস ধরা হয়েছে। কিন্তু যেখানে এত দিন ৩৬.৫ মেগাহার্টজ তরঙ্গ দিয়ে গড়ে ৬ এমবিপিএস গতিই আনা যায়নি, সেখানে একই পরিমাণ তরঙ্গ দিয়ে বর্তমান বিটিএস ব্যবহার করে কীভাবে ফোর-জি সুবিধা দেবে তারা। ২০ এমবিপিএস গতি পেতে ৬০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ইন্টারনেটের বর্তমান গতি ২.১ এমবিপিএস বা এরও চেয়ে কম বলে জানান তিনি।

গ্রাহকেরা প্রতারিত

ফোর-জি সিম পরিবর্তনসহ অসংখ্য সমস্যা নিরসন না করেই ফোর-জি চালু করা গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা বলেও মন্তব্য করেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ।

ইসতিয়াক আহমেদ নামে একজন মোবাইল গ্রাহক বেনারকে বলেন, “অপারেটরগুলো থ্রি-জি সেবার নামে টু-জিও দিচ্ছে না। এটা গ্রাহকদের সঙ্গে রীতিমতো প্রতারণা। সেটা নিয়েই সরকারের মনিটরিং নেই।”

“আর দুদিন ধরে ফোর-জি চালু হলেও দৃশ্যমান কোনো পার্থক্য নেই। তাই আমরা আগের মতোই প্রতারিত হতে যাচ্ছি বলা যায়।”

ক্ষোভ প্রকাশ করেন শাহনেওয়াজ হায়দার নামে একজন ফ্রিল্যান্সারও।

তিনি বেনারকে বলেন, “নামে ফোর জি পাচ্ছি কিন্তু ইন্টারনেটের গতির কোনো তারতম্য নেই। ফোর-জি’র নামে ব্যয় বাড়িয়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হলেও ফ্রিল্যন্সাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

বিদ্যমান মোবাইল সিম ফোর-জি’তে আপগ্রেড করার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে অপারেটররা। তবে এ ধরনের চার্জ নেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন খোদ আইসিটি মন্ত্রীও।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।