থার্টি ফার্স্ট উদযাপনে সরকারের নানা নিষেধাজ্ঞা‏

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.12.28
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-31st থার্টি ফার্স্টকে সামনে রেখে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রবেশের সময় পুলিশের তল্লাশি চলছে ।
বেনার নিউজ

বাংলাদেশে একের পর এক চলা জঙ্গি হামলার মধ্যে দেশবাসীকে নিরাপদ ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন উপহার দেওয়া যেন সরকারের জন্য `চ্যালেঞ্জ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায় থার্টি ফার্স্ট নাইটে সকল ধরনের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নানা ধরনের বাধ্যবাধকতা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার।

এদিন সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠান না করা, জনগণের চলাচল সীমিত করা, বার বন্ধ রাখাসহ নানান বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে দেশের প্রধান প্রধান শহরজুড়ে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরিবর্তে এমন উৎসবের দিনে মানুষকে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়ার এমন সব নির্দেশনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে অনেকেই।

এদিকে গত এপ্রিলে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ছাত্রী লাঞ্ছনার ঘটনায় আটজনকে শনাক্ত করা গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি মর্মে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এটাকে ‘পুলিশের ব্যর্থতা’ উল্লেখ করে এই প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।

সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠান না করার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

মূলত: ইংরেজি নববর্ষকে স্বাগত জানানোর অনুষ্ঠান শুরু হয় রাতে। অথচ সন্ধ্যার পর কো্নো অনুষ্ঠান না করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে তিনি থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে বলেছেন। এছাড়া যেকোনো আনন্দ উৎসব পালনের আগে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পরামর্শ করতে বলেছেন।

সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি শেষ হওয়ার পর অনানুষ্ঠানিক এক আলোচনায় শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে নববর্ষ পালনের পরামর্শ দিয়েছেন।


আটটার মধ্যেই বাসায় প্রবেশের অনুরোধ ডিএমপির

এদিকে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দাদের থার্টিফাস্টে রাত ৮টার মধ্যে বাসায় প্রবেশ করতে রাজধানীবাসীকে অনুরোধ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এছাড়া এদিন সন্ধ্যার পর থেকে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং রাজধানীর সকল পানশালা (বার) বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সোমবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “ওই রাতে ঢাকা মহানগরীতে যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্যই এই বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। গুলশান বারিধারা ও বনানী এসব এলাকায়  ৮টার পর বহিরাগতদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এ এলাকায় প্রবেশে সকাল পর্যন্ত একটিমাত্র রাস্তা (কাকলী) খোলা থাকবে। এছাড়া রাজধানীর সব উন্মুক্ত স্থানে সমাবেশ ও উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত নগরীতে কোনো বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও বহন করা যাবে না এবং রাজধানীর সব পানশালা (বার) বন্ধ থাকবে।”


সমুদ্র সৈকতেও নিষেধাজ্ঞা

নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে এবার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতে কক্সবাজারে থার্টি ফাস্ট নাইট পালনের পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। স্থগিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যটন বর্ষের আতশবাজি অনুষ্ঠানও।

সোমবারের মন্ত্রীসভা বৈঠকের আলোচনায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন আন্তর্জাতিক পর্যটন বর্ষ উপলক্ষে আতশবাজিসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এ বিষয়ে আলোচনার সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী থার্টি ফার্স্ট নাইটে সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠান করা ঠিক হবে না বলে মতামত দেন।

রাশেদ খান মেনন বেনারকে বলেন, পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন বর্ষ উপলক্ষে কক্সবাজারে আয়োজিত আতশবাজি অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। অন্যান্য কর্মসূচি বহাল থাকবে।

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে তিন দিনব্যাপী বিচ কার্নিভালের আয়োজন করা হয়েছে। ইংরেজি নববর্ষকে সামনে রেখে এ কার্নিভাল চলবে ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত।

প্রতি বছর ইংরেজি নববর্ষের প্রথম প্রহরে দেশের সবচেয়ে বড় আয়োজন করা হয় কক্সবাজার সৈকতে। লাইভ কনসার্ট, ডিজে পার্টিসহ বিভিন্ন আয়োজনে সারারাত জমজমাট থাকে সৈকত। এ বছর কার্নিভালে উপলক্ষে ১০ লাখ লোকের সমাগম প্রত্যাশা করেন আয়োজকরা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সৈকতে কাঙ্খিত পর্যটক সমাগম হবে না বলে মনে করছেন আয়োজকরা।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী হোসেন জানান, “সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে নিরাপত্তা জনিত কারণে কক্সবাজার সৈকতে ‘বিচ কার্নিভাল’র অনুষ্ঠান সন্ধ্যার আগেই শেষ করতে হবে। সন্ধ্যার পর সৈকতে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না। সৈকতের পাশাপাশি জেলার অন্যান্য স্থানেও একই নির্দেশ বহাল থাকবে।”


নিরাপত্তার পরিবর্তে অধিকার হরণের’ অভিযোগ

এদিকে এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের দিনে উৎসবকারীদের নিরাপত্তা বিধানের পরিবর্তে এমন নিষেধাজ্ঞা ও বিধি জারিকে ‘অধিকার হরণ’ বলে মনে করছেন অনেকে।

এ বিষয়ে সাংবাদিক আঙ্গুর নাহার বেনারকে বলেন, “বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা সবাই বিশ্ব নাগরিক। ইংরেজি নববর্ষ এখন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান। এদশের নাগরিকদের বিরাট একটি অংশ দিবসটি উদযাপন করবে সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া থার্টি ফার্স্ট মানেই উচ্ছৃঙ্খলা নয়। অনেকে পরিবার পরিজন, বন্ধু বান্ধব নিয়ে দিবসটি উদযাপন করে। সেক্ষেত্রে উৎসবকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া ঠিক নয়”।

তাঁর মতে, দেশে নানা ধরনের অনঅভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে ঠিকই, কিন্তু সেসব অপরাধীদের চিহ্নিত না করে এভাবে সাধারণ মানুষকে ঘরে আটকে রাখা কোন সমাধান নয়। তাছাড়া এ দিন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশে কোন ছুটি নেই। ফলে সকলে দিনে অফিস আদালত শেষ করে রাতে নতুন বছর উদযাপনে অংশ নেন। তাই রাতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।


‘পুলিশ ব্যর্থতায় বর্ষবরণে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন’

নববর্ষের অনুষ্ঠানে নারী হয়রানীর বিষয়ে পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকালে  সেদিন ভিড়ের মধ্যে নারী লাঞ্ছনার প্রমাণ মেলে। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় মামলার অভিযোগ সত্য মর্মে প্রমাণিত হলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে চিহ্নিত আটজনকে গ্রেপ্তার করতে না পারায়, আসামিদের নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হলো। তবে ভবিষ্যতে কোনো তথ্য উদ্ঘাটিত হলে মামলাটি পুনর্জীবিত করা হবে।

তবে এক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে এ প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করেছে সংশ্লিষ্ট মহল। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ বলেন, “যৌন হয়রানির ঘটনায় আসামি চিহ্নিত হওয়ার পরেও আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারা পুলিশের ব্যর্থতা। এ ধরনের স্পর্শকাতর মামলায় এভাবে তাড়াহুড়া করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া ঠিক হয়নি।  প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে আরও সময় নিতে পারতেন তদন্ত কর্মকর্তা।”

ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি লাকি আক্তার বলেন, “পুলিশের এহেন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অপারগতার মধ্য দিয়ে নারী নির্যাতনের বিষয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। চিহ্নিত অপরাধীদের শনাক্ত করতে না পেরে প্রতিবেদন পেশ করা তদন্তের নামে প্রহসন। এর মধ্য দিয়ে যৌন নিপীড়নকে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আরও একবার সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হলো।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন