জাল রুপী পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.04.09
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-Ind ঢাকা বিমান বন্দরে আটক পাকিস্তানি নাগরিকের কাছে পাওয়া নকল ভারতীয় রুপী। ৯ আপ্রিল,২০১৫
বেনার নিউজ

পাকিস্তান থেকে ছাপিয়ে আনা জাল ভারতীয় মুদ্রা পাচারের পথ হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ব্যবহার করা হচ্ছে। মুদ্রা ছাপানো থেকে শুরু করে ভারতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো কাজটাই পাকিস্তানের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে বলে বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দোহা থেকে আসা কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটের যাত্রী পাকিস্তানী নাগরিক সাজ্জাদ হোসেনকে (৪৯) আটক করে বিমান বন্দর কাস্টমস। সিগারেটের কার্টনে করে মুদ্রাগুলো তিনি বিমানবন্দরের গ্রিন চ্যানেল দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়েন।

সাজ্জাদের কাছ থেকে দুই লাখ ৩৮ হাজার রুপী উদ্ধার করা হয়েছে।

“গ্রেপ্তার সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমাণ্ড চাওয়া হবে, আজ শুক্রবার তাঁকে আদালতে পাঠানো হবে,” বেনারকে জানান বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন।

“বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে আমরা জানতে পেরেছি পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় টাকশালে মুদ্রাগুলো ছাপা হয়,” বেনারকে জানান কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার কাজী জিয়াউদ্দীন।

এই রুপীগুলো যে জাল তা শনাক্ত করার মতো প্রযুক্তি বাংলাদেশে না থাকার কথা উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা জানান, “এর আগে কাস্টমসের পক্ষ থেকে সিআইডি ও বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগাযোগ করে জাল রুপী শনাক্ত করা যায়নি। তবে অন্য একটি সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এগুলো জাল রুপী।”

জাল ভারতীয় রুপি (ফেইক ইন্ডিয়ান কারেন্সি নোট বা এফআইসিএন) পাচারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশী, পাকিস্তানী ও ভারতীয় একাধিক নাগরিক বিভিন্ন সময় এদেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার এইসব ব্যাক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে বলেছেন, পাকিস্তানের একটি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে করাচী শহরে এসব মুদ্রা ছাপা ও বিপণন করা হয়।

কাষ্টমস কর্মকর্তারা জানান, মুদ্রাগুলো এতো উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি যে খুব ভালোভাবে পরীক্ষা না করে এগুলোকে জাল হিসেবে শনাক্ত করা অসম্ভব। কোনো কোনো সময় শুধু একই নম্বরের একাধিক নোট দেখে এগুলো জাল হিসেবে চিহ্নিত হয়। এছাড়া আর কোনো গরমিল থাকে না।

তাঁরা আরো জানান, জল ছাপ, বিশেষ সুতা থেকে শুরু করে মুদ্রা ছাপানোতে ব্যবহৃত সব ধরণের নিরাপত্তা প্রযুক্তি এতে ব্যবহৃত হয়। কাগজও উন্নতমানের।

“বিভিন্ন সময় এই চক্রের লোকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই চক্রের অন্যতম  হোতা সোলায়মান মজুমদার, ইমরান, প্রফেসর সেলিমসহ অনেকেই বিগত বছরগুলোতে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন,” বেনারকে জানান ঢাকা মহানগর ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম।

কাস্টমসের কর্মকর্তা জিয়াউদ্দীন বলেন, অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন এই ধরণের কাজে কিছুদিন পরপর নতুন লোকদের ব্যবহার করা হয়। মুদ্রা বহনকারীদের বিশেষভাবে মুদ্রাগুলো মোড়কে বেঁধে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের বিমানবন্দরে বিশেষ নির্দেশনায় এসব মুদ্রার চালান সাধারণত আটকানো হয় না।

কাস্টমস ও ডিবি কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তানের বিমান সংস্থাগুলোর যাত্রীদের বাংলাদেশের বিমানবন্দরে বেশি নিরাপত্তা তল্লাশীর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ কারণে পাকিস্তানীরা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ হয়ে ঢাকায় আসার পথটি ব্যবহার করছেন।

এক্ষেত্রে মুদ্রার চালানটি লাগেজ হিসেবে পাকিস্তানের বিমানবন্দর থেকে বুক হয়ে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ঢাকায় চলে আসছে। বাহকের বাংলাদেশের ভিসা, উড়োজাহাজের টিকেট ইত্যাদি ভ্রমনের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন চক্রের নেতারা। তাঁর কাজ শুধু মুদ্রার মোড়কটি ঢাকায় পৌঁছে দেওয়া।

ঢাকায় আসার পর আরেকটি দল সেই মোড়ক হোটেলে পৌঁছে দেয়। আর হোটেলে থেকে অন্যরা এসে মুদ্রা নিয়ে যায়। উড়োজাহাজের প্রতি চালানে দেড় থেকে আড়াই কোটি রুপি আসে। আর জলপথে প্রতি চালানে ১২/১৩ কোটি রুপি আনার তথ্যও রয়েছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে।

এর আগে ধরা পড়া পাচারকারীদের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য থেকে কাষ্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতের বাজারে ছাড়ার জন্যই এই রুপীগুলো বাংলাদেশে আসে। এর প্রায় পুরোটাই সরাসরি পাচার হয়ে যায় ভারতে। খুব সামান্য একটা অংশ বাংলাদেশের বাজারে ঘোরে।

এখানে চক্রের হোতাদের কাছ থেকে এক লাখ জাল রুপির বাণ্ডেল ২৫ হাজার টাকা দরে কিনেন খুচরা বিক্রেতারা। এর পরের ধাপে এর দাম হয়ে যায় ৩০ হাজার টাকা। আর গরু ব্যবসায়ীরা ৩৫ হাজার টাকায় এক লাখ টাকার এক বান্ডিল কেনেন। এরপর সেই বান্ডিল দিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে গরু কেনেন তাঁরা।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন বলেন, এ ধরণের আসামীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সাধারণত একই ধরণের হয়ে থাকে। এই সিণ্ডিকেট কিছুদিন পরপর মাথাচাড়া দেয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।