বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানোর বিষয়টি শুধু আলোচনায় রয়ে গেল

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.06.17
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-Ind বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল ভারতে প্রদর্শিত হয় না। মে,২০১৫
বেনার নিউজ

আগের মতোই কেবল আলোচনার ঝড় তুলে শেষ হয়ে গেল ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল দেখার উদ্যোগ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় ট্রানজিট, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং বেশ কিছু সমঝোতা হলেও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই ছোট বিষয়টি আটকে রইল।

বাংলাদেশে এমন অনেক পরিবার আছে যেখানে দেশি চ্যানেল দেখাই হয় না। কিন্তু বিদেশি চ্যানেলে বিশেষ করে ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলে হিন্দি সিনেমা বা সিরিয়াল হরদম দেখা হয়।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, ভারতের ৩২টি পে-চ্যানেল এবং আটটি ফ্রি-চ্যানেল বাংলাদেশে সম্প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল দেশটিতে প্রদর্শিত হয় না।

“বাংলাদেশের চ্যানেলে খবর দেখি মাঝেমধ্যে। কবে বাংলাদেশের নাটক বা সিনেমা দেখেছি মনে করতে পারব না,” বেনারকে জানালেন রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গৃহবধূ তামান্না পারভীন, যার দুই মেয়ে এখন কলেজ ছাত্রী।

তামান্না জানান, ভারতের তিনটি চ্যানেলে তিনটি হিন্দি সিরিয়াল মেয়েদের সঙ্গে নিয়মিত দেখেন। শত ব্যস্ততার মধ্যে সিরিয়াল দেখার সময়টি ফ্রি রাখার চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশে ভারতের চ্যানেল দেখা গেলেও ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেল প্রবেশের সুযোগই নেই। গত প্রায় এক দশক ধরে বিষয়টি নিয়ে কেবল আলোচনাই হচ্ছে। সর্বশেষ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় ২০১৩ সালে এ বিষয়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরী হয়েছিল। কিন্তু যথারীতি বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই রয়ে যায়।

গত ৬ ও ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যাবে, এটা চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে মর্মে আশাবাদ ছিল দুই পক্ষের মধ্যে।

মোদীর বাংলাদেশ সফরের একদিন আগে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর দিল্লিতে সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান যাতে ভারতে দেখা যায়, সেই ব্যবস্থা করা হবে।

তখন বিষয়টি বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করা হলে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, “আমরা চাই বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠান এ দেশের মানুষ দেখতে পাক। কীভাবে করা হবে, তা কালই (৬ জুন) জানতে পারবেন।”

এই বক্তব্যের পর ধারণা করা হয়েছিল মোদির বাংলাদেশের সফরের সময় এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু দৃশ্যত কোনো আলোচনা হয়নি।

“বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) যাতে ভারতে দেখা যায় সে জন্য কারিগরি কাজ চলছে,” বেনারকে জানান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু বিদেশি টিভি চ্যানেল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ডাউনলিংক ফি বেশি হওয়ায় ভারতীয় কেব্ল অপারেটররা আগ্রহ প্রকাশ করছেন না। বিষয়টি ভারতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের জনগণের দীর্ঘদিনের একটি দাবি হলো যেহেতু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে দেখা যায়, সেহেতু বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলোও ভারতে দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হোক।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশের মতে, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে না দেখানো হলে ভারতীয় চ্যানেলগুলোও বাংলাদেশে দেখানো উচিত নয়।

২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এখলাসউদ্দিন ভূঁইয়া বাংলাদেশে ভারতের টিভি চ্যানেলের প্রচার নিষিদ্ধ করার দাবিতে রিট আবেদন করেন। পরবর্তীতে তিনি রিটটি প্রত্যাহার করে নেন।  

“বাংলাদেশি টিভি চ্যানেল ভারতের দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হলে বৈষম্য যেমন কমবে, তেমনি দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে বোঝাপড়ার জায়গাটি আরও ভালো হবে,” বেনারকে জানান সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ।

তাঁর মতে, দেশভাগের পর থেকে এ দেশের প্রচুর মানুষ পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে বসবাস করছেন। ফলে বৃহৎ ওই জনগোষ্ঠীর বিরাট আগ্রহ রয়েছে এ দেশের প্রতি। এ জন্য তারা এ দেশের খবরাখবর ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জানতে চায়।

তবে ২০১২ সালের জুনে ভারতীয় হাইকমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান ভারতে দেখানোর ক্ষেত্রে ভারত সরকারের কোনো আইনি বাধা নেই। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে যে কেউ ভারতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল ডাউনলিংক করতে পারবে”।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “ভারতীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ও ভারতে কোনো বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংকের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। কোনো কোম্পানি যদি বাংলাদেশি চ্যানেল ডাউনলিংক করতে চায়, তাহলে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নীতিমালা অনুযায়ী সর্বতোভাবে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল ভারতে ডাউনলিংকের জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেনি”।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “নীতিমালা অনুযায়ী ভারতে কোনো বিদেশি চ্যানেল ডাউনলিংক করতে হলে নির্দিষ্ট নেট মূল্য প্রদান করে ভারতীয় কোম্পানি আইন ১৯৫৬ অনুযায়ী নিবন্ধিত কোম্পানির মাধ্যমে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে”।

তবে আবেদনকারী কোম্পানিকে প্রথম টেলিভিশন চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য ৫ কোটি ভারতীয় রুপি এবং পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিটি অতিরিক্ত চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য ২ কোটি ৫০ লাখ নেট মূল্য পরিশোধ করতে হবে। এই মূল্য ছাড়াও ডাউনলিংকের অনুমতি মঞ্জুরের সময় ১০ লাখ ভারতীয় রুপি ফি দিতে হবে।

এ ছাড়া বিদেশ থেকে আপলিংক করা প্রতিটি চ্যানেল ডাউনলিংকের জন্য বার্ষিক ফি হিসেবে ১৫ লাখ ভারতীয় রুপি দিতে হবে। ডাউনলিংকের নিবন্ধন ও অনুমতি ১০ বছর বহাল থাকবে।

“ভারতের নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশি টিভি চ্যানেল দেখানোর জন্য কয়েক ধাপে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলগুলো এত টাকা দিতে পারবে বলে মনে হয় না,” বেনারকে জানান সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।

তাঁর মতে, ভারত যেহেতু বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ, তাই বাংলাদেশের জন্য এই শর্ত শিথিল করে ভারতেও বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল মানে সংস্কৃতির বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া উচিত।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।