তিন কন্যার লন্ডন জয়

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.05.08
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-UK মা শেখ রেহানার সঙ্গে যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টে বিজয়ী টিউলিপ সিদ্দিক। ৮ মে, ২০১৫
বেনার নিউজ

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে চমক দেখালেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। প্রথমবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে জায়গা করে নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩২ বছর বয়সী এই ভাগ্নি। এই নির্বাচনে রুশনারা আলী(যিনি ২য় দফা নির্বাচিত হলেন,বিপুল ভোটের ব্যবধানে) ও রূপা আশা হক নামে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরো দুই নারীও দেশটির পার্লামেন্টে জায়গা করে নিয়েছেন। এই তিনজনই এমপি পদের জন্য লেবার পার্টির হয়ে লড়েছেন।

টিউলিপের ব্রিটিশ পার্লমেন্টে প্রবেশের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে দুটি দেশের পার্লামেন্টে (বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য) প্রতিনিধিত্ব করার নজির সৃষ্টি হল বঙ্গবন্ধু পরিবা্রের সদস্যদের।

ব্রিটেনের নির্বাচনে টিউলিপসহ তিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কন্যার জয়ে  অভিনন্দন জানিয়েছেন  প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনাও। দেশে বিদেশে যারাই টিউলিপকে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃজ্ঞতাও জানান তিনি। রাষ্ট্রপ্রতি আবদুল হামিদও অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন“এ তিনজনের জয় লন্ডনপ্রবাসী বাঙালিদের মুখ উজ্জ্বল করেছে।”

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে টিউলিপ জয় পেয়েছেন যেখানে তিনি একসময় কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া রুপা হক জয়ী হন ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে এবং টানা দ্বিতীয়বারের মত পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনের দখল নেন রুশনারা আলী।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া টিউলিপ সিদ্দিক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জয় পেয়েছেন। ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ পার্টির প্রার্থীকে তিনি ১১৩৮ ভোটে পরাজিত করেন। শেখ রেহানা কন্যা টিউলিপ পেয়েছেন ২৩ হাজার ৯৭৭টি (৪৪ শতাংশ) ভোট।

ফল ঘোষণার সময় গণনা কেন্দ্রে টিউলিপের মা শেখ রেহানা, স্বামী ক্রিস পার্সি, ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, বোন রূপন্তীসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। জয়ের ফলাফল শোনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শেখ রেহানা বলেন, টিউলিপের জয়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের পার্লামেন্টে একই পরিবারের সদস্য থাকার নজির তৈরি হল। আমার জীবনে আমার বাবা সংসদে ছিলেন; এরপর আমার বোন, এখন যোগ হল আমার মেয়ে। এর থেকে গর্ব আর কি হতে পারে।

টিউলিপের মা হিসাবে পরিচয়ে নতুন করে ‘গর্বিত’ হয়েছেন উল্লেখ করে শেখ রেহানা বলেন, “আমি গর্বিত পিতার সন্তান, গর্বিত বোনের ছোটবোন আর এখন আমার টিউলিপের গর্বিত মা।”

“টিউলিপ যেখানেই থাকুক, যাদের সঙ্গেই থাকুক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুযায়ী সবার জন্যই কাজ করে যাবে”- বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ফল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় টিউলিপ বলেন, “আপনারা যারা আমাকে চেনেন, তারা জানেন যে কঠিন এ কাজের মাত্র শুরু হল। এই দায়িত্ব পালনে আমি সকলের সহযোগিতা চাই।”

২০১০ সালের নির্বাচনে এ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে লেবার পার্টিকে ৪২ ভোটের জয় এনে দেওয়া অভিনেত্রী গ্লেন্ডা জ্যাকসন অবসরে গেলে এবার মনোনয়ন পান তরুণ রাজনীতিবিদ টিউলিপ। শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও শফিক সিদ্দিকীর মেয়ে টিউলিপ লন্ডনের মিচামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কাটে বাংলাদেশ, ভারত এবং সিঙ্গাপুরে।

যুক্তরাজ্যে বৃহস্পতিবার দিনভর ভোটাভুটি শেষে অধিকাংশ আসন থেকে লেবার প্রার্থীদের পরাজয়ের খবর আসতে থাকে। ডেভিড ক্যামরুনের কনজারভেটিভ পার্টি জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও হতাশ করেনি লেবার পার্টির তিন বাংলাদেশি কন্যা।

লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে জয়ী রূপা হক ২২ হাজার ২ ভোট পেয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বি ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী এনজি ব্র-কে অল্প ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে গতবার কনজারভেটিভ পার্টির কাছে হারানো ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটনের ‘টার্গেট সিট’ টি পুনরুদ্ধার করল লেবার পার্টি।

এবারের সাধারণ নির্বাচনে লন্ডনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ১০টি আসনের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল পাবনার মেয়ে রুপার আসনটি। এ কারণে এই আসনের প্রতি গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিন্ন দৃষ্টি আর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের অন্য রকম চ্যালেঞ্জও ছিল। এ আসনে এবার ভোট পড়েছে ৭১ শতাংশ। লেবার পার্টির জন্য এ আসনটি পুনরুদ্ধার করার পথে রূপা হক পেয়েছেন ৪৩.২ শতাংশ ভোট।

১৯৭২ সালে ইলিংয়ে জন্ম নেওয়া রূপা হক রাজনীতি, সামাজিক বিজ্ঞান ও আইন বিষয়ে ক্যামব্রিজে বড়েছেন। কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে তিনি সমাজ বিজ্ঞান, অপরাধ বিজ্ঞান, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অধ্যায়নের মতো বিষয়ও পড়ান। এর আগে ডেপুটি মেয়র হিসাবে স্থানীয় সরকারেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৯১ সালে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া রুপা এর আগে ২০০৫ সালের নির্বাচনে চেশাম ও এমারশাম আসন থেকে লেবার পার্টির মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি। এছাড়া ২০০৪ সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচনেও প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি।

তবে রুশনারার গল্পটাও নতুন নয়। পাঁচবছর আগে প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যান সিলেটের মেয়ে রুশনারা আলী। এবার ২৪ হাজারের বেশি ভোটে বিজয়ী হয়েছেন অক্সফোর্ড-পড়ুয়া উদীয়মান রাজনীতিক। ১৯৭৫ সালে বিশ্বনাথে জন্ম নেওয়া রুশনারা প্রথমবার যুক্তরাজ্যের এমপি নির্বাচিত হয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও শিক্ষা-বিষয়ক ছায়ামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি পার্লামেন্টারি ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য হিসেবে মেয়াদ পূর্ণ করেন।

এই তিন কন্যার জয়ে সকল বাংলাদেশিদের মধ্যেও খুশির বন্যা বইছে। নারীর ক্ষমতায়নসহ ‍বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক শক্তিশালী করতেও তারা ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের।

এ প্রসঙ্গে  সুইডেনে অবস্থান করা বাংলাদেশি সাংবাদিক ও কলামিস্ট সাব্বির খান এ বিষয়ে বেনারকে বলেন, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তিনজন নারীর একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হওয়া একাধারে ঐতিহাসিক এবং বিশ্বের প্রতিটা বাঙ্গালীর জন্য গর্বের বিষয়। শেকড়ে বাংলাদেশ থাকলেও, মূলত তারা সবাই বৃটিশ নাগরিক। বৃটেনের রাজনীতিই তাদের পদচারনা মূখ্য ক্ষেত্র হবে, এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এখানে উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে, এই তিন নারী সাংসদ লন্ডনের যে সব এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেগুলো খুবই পরিচিত মৌলবাদের ঘাটি হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত। শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের মৌলবাদীদের আখড়া হিসেবে ঐ অঞ্চলগুলো পরিচিত। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই তিন প্রথিতযথা নারী “নারীর ক্ষমতায়ন এবং স্বাধীনতা”-র প্রশ্নে ওই সব অঞ্চলে বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারবে বলে আমি মনে করি।

তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যের মানবিক গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে বিশ্বের যেসব জঙ্গি মৌলবাদীরা সেদেশে বসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৌলবাদের বিষ এবং সহিংসতা ছড়াচ্ছে, এমন কি কোমলমতি শিশুদেরও জিহাদের নামে বিপথে টেনে আনছে, তা বন্ধ হবে বলেই আমি মনে করি। উগ্র জঙ্গী- এবং সন্ত্রাসবাদের সরাসরি টার্গেট যেহেতু বাংলাদেশ, মৌলবাদের উৎপত্তিস্থলে আঘাত হানতে পারলে তা আর বিস্তার লাভ করতে পারবে না। নির্বাচিত তিন নারী সাংসদ তা করতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।”

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেও তাদের অবদান রাখার যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যুক্তরাজ্যে একাত্তরের যেসব যুদ্ধাপরাধী অবস্থান করছেন, তাদের বাংলাদেশে ফেরত আনার ব্যাপারেও তারা বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করতে পারেন। তাদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের ভিত আগের চেয়ে আরো বেশি মজবুত হবে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।