নারী-পুরুষ সমতা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.10.26
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
161026-BD-Women1000.jpg বাংলাদেশের নারীরা এখন সব ধরনের কাজ করছেন, এমনটি ট্রাফিক পুলিশেও যোগ দিচ্ছেন নারীরা। আগস্ট ১৫,২০১৬।
স্টার মেইল।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচক প্রতিবেদন ২০১৬ বলছে, নারী-পুরুষের মধ্যকার সমতা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে রয়েছে।আর সবচেয়ে পিছিয়ে আছে পাকিস্তান।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণে নারী ও পুরুষের বৈষম্য কোন দেশে কতটা তার ওপর ভিত্তি করে ২০০৬ সাল থেকে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচক প্রকাশ করে আসছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, সম্পদ ও প্রযুক্তিতে অধিকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পরিবার, সেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা এবং স্বাস্থ্য আলাদা আলাদা শ্রেণিতে কোন দেশ কেমন করল বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচকে তার ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

এ বছর ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো যথাক্রমে; ভারত ৮৭, শ্রীলংকা ১০০,নেপাল ১১০, মালদ্বীপ ১১৫, ভুটান ১২১ ও পাকিস্তান ১৪৩ তম অবস্থানে আছে। তালিকায় সবশেষে আছে ইয়েমেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটির অবস্থান ১৪৪।

সার্বিক সূচকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আইসল্যান্ড। এরপর আছে ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, রুয়ান্ডা, আয়ারল্যান্ড, ফিলিপাইন, স্লোভেনিয়া ও নিউজিল্যান্ড।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই নারী-পুরুষে অসমতা চোখে পড়ার মতো। নারীরা পুরুষের চেয়ে বছরে গড়ে ৩৯ দিন বেশি কাজ করেন। আর দিনে বেশি কাজ করেন গড়ে ৫০ মিনিট করে।

নারী-পুরুষের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আছে, তা দূর করতে ১৭০ বছর লেগে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সন্তান লালন-পালন করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ হলো বৈষম্য দূর করতে অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব নারী ও পুরুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য বিশ্লেষক ভ্যাজেলিনা র‌্যাচেভা বলেন, “সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মা ছুটি ভাগ করে নিতে পারেন। সিদ্ধান্ত যখন নারী-পুরুষ দুজনে মিলে নেবেন তখন পরিকল্পনা মাফিক সন্তান জন্ম দেওয়া থেকে শুরু করে কে, কি দায়িত্ব পালন করবেন তা ভাগাভাগি করে নিতে পারেন।”

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ সমতা অর্জনের পথে শীর্ষে অবস্থান করলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে এখনও পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে আছেন নারীরা। অর্থনৈতিক খাতে নেতৃত্ব প্রদান, সম্পদ অর্জন ও ভোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে পুরুষেরা এগিয়ে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে, অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারীরা এগিয়েছেন। তবু সমতার জায়গা থেকে অনেক পিছিয়ে আছেন।

এর পেছনে মূল কারণ পরিবার ও সমাজ; সন্তান লালন-পালন ও সংসার সামলানোর মতো বিনা পয়সার কাজে নারীদের আটকে রাখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না।

শ্রমবাজারেও নারীর অন্তর্ভুক্তিকে অনেক চাকরিদাতাই সহজভাবে নেন না। ‘মাতৃত্ব’, ‘সন্তান লালন-পালন’ ইত্যাদি দায়িত্ব নারীদের বহন করতে হয় বলেই চাকরিদাতাদের অনেকেই নারীদের চাকরি দিতে চান না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, “গত দুই দশকে নারীদের অনেকটা সমীহ করে চলার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। চাকরিদাতারা দেখছেন নারীরা যোগ্যতা দক্ষতায় পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে নেই।”

“তারপরও এমন ধ্যান–ধারণার চাকরিদাতার সংখ্যা কম নয়, যারা মনে করেন নারীদের চাকরি দেওয়ার অর্থ ‘বাড়তি মাথাব্যথা’, ‘উটকো ঝামেলা নেওয়া’। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি নারীদের অংশগ্রহণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ না নেয় তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না,” জানান নিয়াজ আহমেদ।

অর্থনৈতিক দিক থেকে নারীরা পিছিয়ে থাকলেও রাজনীতিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ বলে উল্লেখ করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদনটি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা বেনারকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয়ভাবে শুধু নারীদের ক্ষমতায়িত করেছেন, তা-ই নয়। তিনি রাজনীতিতেও নারীদের এগিয়ে দিতে চাইছেন। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পীকার, সংসদ উপনেতা, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী কমিটি সভাপতিমণ্ডলীতে নারীরা জায়গা পাচ্ছেন।”

তিনি বলেন, নারীরা দেখছেন তাঁদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে, সে কারণে তাঁরা রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

অপুষ্টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে একটা সময় মারাত্মক বৈষম্য ছিল। নতুন এই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অপুষ্টিতে ভোগা মেয়ে ও ছেলে শিশুর সংখ্যা সমান।

মাতৃমৃত্যুর হারও বাংলাদেশে কমে এসেছে। দেশে পারিবারিক সহিংসতা রোধে আইন হওয়ার বিষযটি ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তবে শিক্ষা খাতে প্রাথমিক স্তরে মেয়ে শিশু ও ছেলে শিশুর মধ্যে বৈষম্য না থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে নারীদের ঝরে পড়া সামগ্রিকভাবে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য হচ্ছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে লিঙ্গ সমতা ফিরে এসেছে।

এ বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বেনারকে জানান, শিক্ষা এখন সামাজিক ও পারিবারিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে সরকার, বেসরকারি ও দাতা সংস্থার নানা অবদান যুক্ত হয়েছে। এর ফলে শিক্ষায় লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি আর্থ–সামাজিক অগ্রগতি ঘটছে।

 

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।