‘অত্যন্ত ক্ষতিকর’ বাতাসের কবলে রাজধানীসহ ৮ শহর

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.01.26
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-air অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বাতাসের কবলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ ছয় মহানগর ও এর পাশের আরো দুটি শহর।
অনলাইন

অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বাতাসের কবলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ ছয় মহানগর ও এর পাশের আরো দুটি শহর। এসব এলাকার বাতাসের মান পরীক্ষা করে  এ তথ্য জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাভাবিক নিয়মে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের ফুসফুস দুই হাজার লিটার বাতাস গ্রহণ করে। আর এত অস্বাস্থ্যকর বাতাসে সেই শ্বাস নিতে গিয়ে অক্সিজেনের পরিবর্তে ফুসফুসে ‘বিষ’ ঢুকাচ্ছে মানুষ। যা তার স্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাবনাকে হ্রাস করছে।


সর্বনিম্ন মানের বাতাস

এমন অবস্থায় একটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন শহরের বাতাসের মান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতায় ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (কেস) প্রকল্পের এই পর্যালোচনা থেকে সর্বনিম্ন মানের বাতাসের নমুনা পাওয়া গেছে।

জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় চারটি, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট মহানগর এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে একটি করে মোট ১১টি কেন্দ্রে নির্মল বায়ু পরীক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব শহরের বায়ু পরীক্ষা চলছে।  নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে বাতাসকে পাঁচটি মানে  চিহ্নিত করা হয়। মানগুলো হল- ভালো, মধ্যম, অস্বাস্থ্যকর, খুব অস্বাস্থ্যকর, অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। পর্যবেক্ষকরা প্রায় প্রতিদিন এই কেন্দ্রগুলো থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করছেন।

তারা বলছেন, এসব শহরের ১১টি কেন্দ্র থেকে সর্বনিম্ন মানের বাতাস পাওয়া যাচ্ছে। যার চেয়ে খারাপ মান আর হতে পারে না।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, নভেম্বর মাস থেকে ঢাকাসহ ছয়টি মহানগরেই অত্যন্ত নিম্ন মানের ও অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বাতাস পাওয়া যাচ্ছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত তা চলবে বলে আশঙ্কা করেছেন তাদের।


‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ বাতাস

গবেষকরা বলছেন, এই সময়ের ধুলাবালির মধ্যে থাকা বস্তুকণাগুলো মানুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। তবে বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন মনো-অক্সাইড, সিসা, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড, পার্টিকুলেট ম্যাটার বা বস্তুকণা ও সালফার ডাই-অক্সাইডও বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ।  জানা যায়, বাতাসের নিরাপদ মাত্রা কতটুকু এবং ক্ষতিকর বস্তুকণা সে তুলনায় কতটা বেশি তার ভিত্তিতে সারা বিশ্বে একই ধরনের ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ (একিউআই) সূচক ব্যবহার করেন বিশেষজ্ঞরা।

এই সূচি অনুযায়ী ০-৫০ ভালো, ৫১-১০০ মধ্যম, ১০১-১৫০ সতর্কাবস্থা, ১৫১-২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১-৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-৫০০ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ধরা হয়েছে। এদিকে গত ২০ জানুয়ারি চারটি কেন্দ্রের গড় হিসাব অনুযায়ী ঢাকার বাতাসের মান পাওয়া গেছে ৩০৬, চট্টগ্রামের ৩২৮, খুলনার ৪১৫, গাজীপুরের ৩১৭ এবং নারায়ণগঞ্জের ৫২৩।

আর সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি আরবান ল্যাবের হিসাব বলছে, প্রতি মাইক্রোগ্রাম বাতাসে ১-১২ মাইক্রোমিটার বস্তুকণা থাকার কথা। তবে গত ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় এই মাত্রা ছিল যথাক্রমে ২২৫, ১৮৪, ২১৪, ২০২ এবং ২২৩ মাইক্রোমিটার।


সবচেয়ে বেশি মানুষ মরছে বায়ুদূষণে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

এক গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  (ডব্লিউএইচও) বলছে,  বিশ্বজুড়ে মানুষ মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ বায়ুদূষণের ফলে হওয়া ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)। এছাড়া বাংলাদেশেও বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।  সংস্থাটি বলছে,  ২০১২ সালে সিওপিডি’র কারণে যে পাঁচটি দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার একটি হলো বাংলাদেশ।

বাতাসের মান বৃদ্ধির জন্য গণবিজ্ঞপ্তি

পরিবেশ অধিদপ্তর গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে বাতাসের মান বৃদ্ধি ও জনজীবনের ক্ষতির মাত্রা কমাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে আসছে। যাতে নির্মাণকাজের সময় চারপাশ ঢেকে রাখা ও পানি ছিটানো, স্টিল,গাড়ি ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা, রি-রোলিং মিলস ও সিমেন্ট কারখানাগুলোয় বস্তুকণা নিয়ন্ত্রণমূলক যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও ধুলাবালি কমাতে বাড়ির চারপাশে সবুজায়ন করা, রাস্তা খোঁড়ার সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঢেকে রাখা, ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার, যানজট এড়াতে ট্রাফিক আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


বেড়েছে হাঁপানি রোগী

সিওপিডিতে আক্রান্ত রোগীর খুসখুসে কাশি হয়। অল্প পরিশ্রমেই তারা হাঁপাতে থাকে। জোরে জোরে শ্বাস নেয় এবং রোগী সবসময় দম বন্ধ অবস্থা অনুভব করেন। এদিকে শীতের এই মৌসুমে হাঁপানি ও সিওপিডির রোগী সংখ্যা এখন পর্যন্ত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছে  জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুদ্দিন বেননূর বেনারকে জানান,  শহরাঞ্চলে সিওপিডি রোগের প্রধান কারণ ধুলাবালি ও ধোঁয়া। তাই ধুলো-ধোঁয়া এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। তবে ধূমপানের কারণেও সিওপিডি হয়ে থাকে বলে জানান তিনি। তাই ধুমপান না করার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।


আইন না মানাই কারণ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ আইন না মানা। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোতে রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি, ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে অন্যসকল ক্ষেত্রেই নিয়মকানুন মানা হয় না। পুরোনো যানবাহনগুলো প্রতিনিয়িত বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়ায়। আর রাজধানী ও এর আশেপাশে গড়ে ওঠা অধিকাংশ ইটভাটাই নিয়ম মেনে চলছে না।

এ বিষয়ে কেস প্রকল্পের পরিচালক এস এম মুনজুরুল হান্নান খান জানান, ‘অন্যান্য ক্ষেত্রের মত বায়ুদূষণ  রোধেরও নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা রয়েছে।  ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করে দূষণকারীর ছয় মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমন  সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।’


বায়ু দূষণ রোধে পদক্ষেপ জানতে চায় হাই কোর্ট

এদিকে দুই ঢাকা (উত্তর ও দক্ষিণ), গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বায়ু দূষণ রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে  দেশের উচ্চ আদালত।

গত ১৭ জানুয়ারি চার সিটিতে বায়ু দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জুলহাস উদ্দিন আহমদ ও মো. মজিবুর রহমানের করা একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে  সোমবার বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের হাই কোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এই আদেশ দেয়।  আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।

রুলে চার সিটি এলাকার বায়ু থেকে ধুলো, ধোঁয়া ও প্রাণঘাতী উপাদান অপসারণে বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছে বলে জানান রিটকারী আইনজীবী জুলহাস উদ্দিন। রুলে স্বরাষ্ট্র সচিব, বন ও পরিবেশ সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে বিবাদি করা হয়েছে।

রিট আবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাস্তা ঝাড়ু দেয় সিটি করপোরেশনের কর্মীরা। যার ফলে বিপুল পরিমাণ ধুলো-বালি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও প্রায় প্রতিটি রাস্তার পাশে ধুলাবালু ও আবর্জনা জড়ো করে রাখা হয়। যা যানবাহনের মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়। এসব ধুলা ও আবর্জনা যখন বাতাসে পোড়ানো হয় তখন উৎপাদিত ক্ষতিকর ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে নগরবাসী।

বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর বায়ু দূষণের কারণে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে ও ৬৫ লাখ লোক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওই পরিসংখ্যানের সূত্র ধরেই জনস্বার্থে রিটটি করা হয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।