বাংলাদেশে আবারও ব্লগার খুন

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.05.12
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-blogger সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক অনন্তকে মৃত ঘোষণা করেন। তার স্বজন ও বন্ধুরা শোক প্রকাশ করছেন। ১২ মে,২০১৫
এএফপি

মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাসের মাথায় বাংলাদেশে আবারও অনন্ত বিজয় দাশ নামে আরেক ব্লগারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যিনি নিজেও মুক্তমনা ব্লগে লিখতেন। এই খুনের পর আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে আনসার বাংলা ৮ নামে একটি টুইটার একাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় জেলা সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর আগে গত ৩০ মার্চ ঢাকার বেগুনবাড়িতে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমানকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, একই কায়দায় খুন হলেন বিজয় দাশ।  ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার রাজীব হত্যার মধ্য দিয়েই মুলত বাংলাদেশে ব্লগার হত্যা শুরু হয়।

অনন্ত খুনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গওসুল হোসেন। তিনি জানান, সকাল ৯টার দিকে সুবিদবাজারের বনকলাপাড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে বেরিয়ে রিকশায় করে শহরের দিকে যাওয়ার পথে হামলার মুখে পড়েন অনন্ত বিজয় দাশ।

তিনি বলেন, “মুখোশধারী চারজন অস্ত্রধারী তাকে কুপিয়ে আহত করে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। লেখালেখির কারণে তিনি খুন হয়েছেন কিনা বিষযটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ”

বিনয় ভদ্র নামে অনন্ত বিজয় দাশের ঘণিষ্ঠ বন্ধু জানান, “সম্প্রতি ঢাকায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল, বিজয়কেও ঠিক একইভাবে আঘাত করে করা হয়েছে। ”

পেশায় ব্যাংক কর্মকর্তা ৩০ বছর বয়সী অনন্ত বিজয় ছিলেন সিলেটে গণজাগরণ মঞ্চেরঅন্যতম সংগঠক। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ও যুক্তিনির্ভর লেখালেখির জন্য| তিনি ২০০৬ সালে তিনি মুক্তমনা র্যাশনালিস্ট অ্যাওয়ার্ড পান।  এছাড়া সিলেট থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞান বিষয়ক একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন বিজয়।  তিনি অভিজিৎ ও ওয়াসিকুর হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এমন কি নিহত হওয়ার আগের দিনই ফেইসবুকের মাধ্যমে  এ দুই হত্যাকান্ডের পরবর্তি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিজয়।

খুন হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও তিনি তার সর্বশেষ পোস্ট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে ক্ষমতাসীন দলের একজন সাংসদের প্রকাশ্যে চাবুক মারারইচ্ছা প্রকাশের সমালোচনা করেন।

মঙ্গলবার খুব কাছ থেকে হত্যাকান্ডটি দেখা স্থানীয় চা দোকানি আব্দুস সোবহান জানান, মুখোশ পর চারজন যুবক বিজয় দাশকে তাড়া করতে করতে কোপাতে থাকে। তার দোকানের পাশে আসামাত্র লুটিয়ে পড়েন বিজয়। এরপর হাতে থাকা চাপাতি দিয়ে আরো চার কোপ দিয়ে ফেলে রেখে যায় মুখোশধারীরা।

সোবহান বলেন, "ঘটনাটি দেখে শরীর শিরশির করে ওঠে। এসময় উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে ঘাতকরা বলে, নড়াচড়া করলে তোকেও জবাই করে রেখে যাবো। ততক্ষণে বিজয়ের তাজা প্রাণটি নিথর হয়ে যায়।"

বিজয় হত্যার দায় স্বীকার করে একাধিক টুইট বার্তায় আনসার বাংলা-৮ নামের এক আইডি থেকে উল্লাস প্রকাশ করা হয়। হত্যাকাণ্ডের এক ঘণ্টার পরই সকাল ১০টা ২৬ মিনিটে আনসার বাংলা ৮ একটি টুইটে বলে, “আল্লাহু আকবার!!! বাংলাদেশে আরও একজনকে হত্যা করা হয়েছে।শিগগিরই আমাদের অপারেশন টিমের কাছ থেকে খবরটি নিশ্চিত করব আমরা।”

ওই টুইটের এক ঘণ্টা পর পরবর্তি টুইটে বলা হয়, “আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের ভাইয়েরা ১০০% নিরাপদ”

এরপর পৌনে ১২টায় আরেকটি টুইটে বলা হয়, “আল কায়েদা ইন ইনডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট সিলেটে অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকার করেছে।”

পরবর্তি টুইটগুলোতে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকারকারী আনসার বাংলা ৮ এর নাম ব্যবহার না করে একিউআইএসের নাম ব্যবহারের জন্য বলা হয়।


ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ
ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ
ফেসবুক

 

অপরাধীদের এমন উল্লাসে চললেও এ হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে নাগরিক সমাজ। প্রশ্ন উঠেছে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে। বিচার ব্যবস্থার দৈণ্যতা নিয়ে। অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার প্রতিবাদে সিলেট মহানগর এলাকায় আগামী বুধবার (১৩ মে) আধাবেলা হরতাল ডেকেছে সিলেট গণজাগরণ মঞ্চ।

 

এ হরতালে সমর্থন দিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণাদিয়েছেন প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং উপস্থিত সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মীরা। এছাড়া হরতালের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, যুবমহাজোট, ছাত্র মহাজোট ও হিউম্যান রাইটস্ কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিস্(এইচআরসিবিএম) এবং বাংলাদেশ মাইনোরিটি ওয়াচ।


সিলেট গলজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবু বলেন, “মুক্তচিন্তার মানুষরা একের পর একহত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন কোন পদক্ষেপই নিচ্ছে না। এভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকলে বাংলাদেশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।”

এদিকে রাজধানীতেও অনন্ত হত্যার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (১২ মে) বিকেল ৪টায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করবে গণজাগরণ মঞ্চ।

অভিজিত, ওয়াশিকুরের পর নির্মমভাবে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার প্রতিবাদে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় চলছে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট গিবসনও। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরেই এক টুইট বার্তায় বাংলাদেশে অবশ্যই মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঝর্ণা মনি নামে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তার ফেসবুকে লিখেছেন “…কেনই বা ব্লগার হওয়ার অপরাধে (!) একজন মানবসন্তানকে পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা করা হবে? …চাপাতির কোপে রক্তার্ত হৃদয়, আর কত? আর কত?? কত প্রাণ হবে বলিদান???

প্রথাবিরোধী লেখক ডক্টর হুমায়ুন আজাদ আমার অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তি। স্যারের ওপর বর্বর হামলার প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠেছিলাম আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। পেরিয়ে গেছে অনেকদিন। আজও শাস্তি পায়নি দায়ীরা। আর বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে ডক্টর আজাদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে গণজাগরণ মঞ্চের সহযোদ্ধা রাজীব, বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ডক্টর অভিজিৎ রায়, ব্লগার বাবু আর আজকের অনন্ত।এরপর কার পালা? আমি না আপনি? ”

এর আগে একই কায়দায় ২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ ও ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হায়দারকেও হত্যা করা হয়।  অভিজিত, ওয়াশিকুরের মত সেসব হত্যার বিচার আজও হয়নি।

এই বিচারহীনতার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম-বোয়াফ এর সভাপতি কবির চৌধুরী তন্ময় বলেন, “ব্লগার রাজীব হত্যার মধ্য দিয়ে ব্লগারদের হত্যার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা দিন দিন ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্করতর হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নিয়ে যারাই মিডিয়া কিংবা সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখালেখি করে নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানভিত্তিক জীবনচর্চার সহায়তা করে থাকে, তাদেরকেই একের পর এক হত্যা করে চলেছে ধর্মান্ধ মৌলবাদী অপশক্তি ও পর্দার আড়ালে থাকা রাজনৈতিক অপতৎপরতাকারী ব্যক্তি- ব্যক্তি-মহল।”

অনন্ত বিজয় দাশ হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডও আনসারুল্লার স্লিপার সেলের কাজ। আমরা এই স্লিপার সেলের সদস্যদের গ্রেফতারে কাজ করে যাচ্ছি।”

“সন্ত্রাসবাদী গ্রুপগুলোর ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারির জন্য পৃথক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন”-উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি উত্থাপনের পর বর্তমানে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে রয়েছে ।”

ঢাকায় অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব স্বীকার করে কিছু দিন আগে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার সংশ্লিষ্টতার দাবি করা হয়েছিল।তবে এই সংগঠনটির তৎপরতার বিষয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের কাছে তেমন তথ্য নেই। গোয়েন্দাদের ধারণা, আল কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।