যক্ষ্মায় ভোগা শিশুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.06.24
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-child বাংলাদেশে যক্ষ্মায় ভোগা শিশুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। জুন,২০১৫
বেনার নিউজ

স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন সাফল্যের মধ্যে দুঃসংবাদ হচ্ছে, বাংলাদেশে যক্ষ্মায় ভোগা শিশুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, গত বছর যত রোগীর যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে তাদের শতকরা তিন দশমিক ৩৭ শতাংশ শিশু যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশি।

যক্ষ্মা ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগ নির্ণয়ে জটিলতার কারণে শিশু রোগীদের শনাক্ত করা কঠিন। ঠিক সময়ে অনেক রোগীর রোগ শনাক্ত হয় না, শিশুরা ভোগে এবং মারাও যায়।

“বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, দেশে শনাক্ত রোগীদের ১০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু। ২০১৪ সালে এই জরিপের পর নতুন করে আমরা আরেকটি বড় জরিপ করছি। আগের জরিপে যারা শনাক্ত হয়নি, তারাও আশা করছি এবার শনাক্ত হবে,” বেনারকে জানান জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর মোজাম্মেল হক।

এই কর্মসূচির জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দেশে শিশু যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৯৭ জন যক্ষ্মা রোগীর মধ্যে ৪ হাজার ৮৩৩ জন শিশু (২.৯৮ শতাংশ) যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছিল।

২০১৩ সালে ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৫ জন যক্ষ্মা রোগীর মধ্যে ৫ হাজার ৪৪ জন শিশু যক্ষ্মা রোগী (৩ শতাংশ) শনাক্ত হয়।
সবশেষ ২০১৪ সালে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ জনের মধ্যে ৬ হাজার ৩১৮ জন শিশু যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত (৩.৩৭ শতাংশ) হয়েছে।


ডটস পদ্ধতিতে যক্ষ্ণার চিকিৎসা

“বর্তমানে শুধু গাজীপুরেই ১১৩ শিশুকে ডটস এর আওতায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে,” বেনারকে জানান ব্র্যাকের সেন্ট্রাল মিডিয়া ইউনিটের কর্মকর্তা ফজলুল ইসলাম। ডটস পদ্ধতি নিয়মমাফিক একটি চিকিৎসা কৌশল।

এই কর্মসূচির আওতায় কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। রোগী আসার পর ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকারা সেবনবিধি অনুযায়ী রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খাইয়ে দেন।

শিশু যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সঙ্গে ব্র্যাকের নেতৃত্বে ৪২ টি বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে। ১৯৯৩ সাল থেকে ডটস পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।


চিকিৎসকেরা জানান, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে যক্ষ্মা রোগ হয়ে থাকে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়া ও অপুষ্টির কারণে শিশুর ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে বেশি। সময় মতো বিসিজি টিকা না নেওয়ার কারণেও শিশু যক্ষ্মায় আক্রান্ত হতে পারে।

প্রতিবেদনেও এক থেকে চার বছরের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা যাচ্ছে, গ্রামের তুলনায় শহরে যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি।

এর পেছনে দু’ধরনের কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন টিবি বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, গ্রামে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ কম থাকায় শনাক্তের হার কম (২ দশমিক ৩ শতাংশ)। এই হার আরও বেশি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বসতি, ভাসমান জনগোষ্ঠী ও ঘনবসতির কারণে শহরে যক্ষ্মা রোগী বেশি (৫ শতাংশ)।


শিশুদের রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার দীর্ঘ প্রক্রিয়া

গবেষণায় বলা হয়েছে, অত্যাধুনিক জিন এক্সপার্ট মেশিনে প্রাপ্তবয়স্কদের ৯৮ শতাংশের যক্ষ্মা নির্ণয় করা সম্ভব। কিন্তু ৩৪ শতাংশ শিশুর যক্ষ্মা এই যন্ত্রেও পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

“সিংহভাগ ক্ষেত্রে যক্ষ্মা নির্ণয় করা হয় কফ পরীক্ষা থেকে।শিশুরা কফ দিতে পারে না। বিশ্বজুড়ে এই সমস্যা আছে,” বেনারকে জানান ন্যাশনাল টিউবার কিউলোসিস রেফারেন্স ল্যাবরেটরি (এনটিআরএল) এর প্রধান এস এম মোস্তফা কামাল।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এখন টিউবার কিউলিন নামের একটি  পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছেন। এ পদ্ধতিতে চামড়ার নিচে ইনজেকশন দেওয়া হয়।
টিবি বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাথমিক অবস্থায় এক্স-রেতে যক্ষ্মা ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু ফুসফুসে যক্ষ্মা ছড়িয়ে পড়লে এক্স-রে তে ধরা পড়ে। তাঁরা উপসর্গ দেখে শিশুদের এক্স-রে করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন।

“যখন কোনো শিশু কফ, কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসবে তখন শিশুর আত্মীয়স্বজনের কারও যক্ষ্মা আছে কি না এ বিষয়টি জানা জরুরি,” বেনারকে জানান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজি রকিবুল ইসলাম।

তাঁর মতে, ফুসফুস ছাড়াও শিশুদের হাড়, পেট, তলপেট, মস্তিষ্ক ও চামড়ায় যক্ষ্মা হতে পারে। হাড়ে ব্যথা, শিরদাঁড়া ফুলে যাওয়া, চামড়ায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা ক্ষত, পেটে পানি আসা, ব্যথা, মলত্যাগের সময় রক্ত যাওয়া, তাকাতে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলেও যক্ষ্মা পরীক্ষা করতে হবে।

ডটস পদ্ধতির এই কর্মসূচির আওতায় যেহেতু কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। রোগী আসার পর ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকারা সেবনবিধি অনুযায়ী রোগীদের নিয়মিত ওষুধ খাইয়ে দেন।

যেহেতু ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত এই চিকিৎসা দিতে হয়, সেহেতু দরিদ্র ও অসচেতন রোগীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। লম্বা সময় ধরে চিকিৎসার জন্য ওষুধ কেনার টাকাও একটা বড় কারণ।

“একসময় বলা হতো যার হবে যক্ষ্মা, তার নেই রক্ষা। কিন্তু এখন যক্ষ্মা নির্মূল হয়, এমনকি এই ওষুধ বিণামূল্যে দেওয়া হয় সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে,” জানান শেফালি ঘোষ যিনি হলিফ্যামিলি হাসপাতালের ডটস এর কর্মী।  

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন