মোবাইল কোর্ট আইনের সংশোধন, অপপ্রয়োগের আশংকা

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.06.23
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-court গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে মোবাইল কোর্টকে আরো ক্ষমতা দিয়ে আইনের সংশোধনী আনা হয়। ২৩ জুন,২০১৫
বেনার নিউজ

অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার না করলেও সাক্ষ্য নিয়ে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তাকে শাস্তি দিতে পারবে বাংলাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এমন বিধান রেখে ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’ সংশোধন করেছে মন্ত্রিসভা। সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বিষয়ক খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই ব্যবস্থা ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়াবে। তবে মানবাধিকার সংগঠক বা আইনজীবীদের অনেকে মনে করেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতকে এমন ক্ষমতা দেয়া হলে এর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা থাকে।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদের সচিব মোঃ মোশাররফ হোসাইন ভুইঞা বলেন,  ২০০৯ সালের প্রণয়ন করা প্রচলিত মোবাইল কোর্ট আইন অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংঘটিত হওয়া কিংবা অপরাধী দোষ স্বীকার করলেই কেবল শাস্তি দেয়া যায়। অনেকেই দোষ করে তা স্বীকার করেন না। ফলে মোবাইল কোর্টের আওতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাকে শাস্তি দিতে পারেন না। আইনের এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই সংশোধনী আনা হচ্ছে এবং নতুন বিধান অনুযায়ী, দোষ স্বীকার করলে শাস্তি তো পাবেনই, দোষ স্বীকার না করলে সাক্ষ্য নিয়ে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে ম্যাজিস্ট্রেট শাস্তি দিতে পারবেন।

তবে মানবাধিকার আইনজীবি মনজিল মোরশেদ মনে করেন, “এ ধরনের আইনের সংশোধনী আনা আইনসম্মত নয়। এমনকি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বা মাযদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থি।”

তিনি বেনারকে বলেন, “বিচার করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের, প্রসাশনের নয়। যেটা মাযদার হোসেন বা বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলায় স্পষ্টত বলা আছে। এছাড়া এর আগে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া হয়। যা চ্যালেঞ্জ করে করা একটি মামলা হাইকোর্টে শুনানি চলছে। সে পরিস্থিতিতে আবারও মোবাইল কোর্ট আইন সংশোধন করে বিচারিক ক্ষমতা প্রসাশনকে দেওয়া আইনসম্মত নয়।”

মোবাইল কোর্ট আইনের কারণে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার মৌলিক অধিকার থেকে অভিযুক্তরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করেন আরেক আইনজীবী শাহদীন মালিক। তার মতে, মোবাইল কোর্ট আইনে অপব্যবহারের সুযোগ থাকে।

তিনি বলেন, সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই করা বিচার ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু ভ্রাম্যমান আদালতের তাৎক্ষনিক বিচারে তা সম্ভব হয় না।

তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “সরকারের মন্ত্রীরা মনে করেন যে এই আইনের অপব্যবহারের কোন আশঙ্কা নেই। এছাড়া আইনটি সংশোধনের ফলে বিচারিক আদালতের ক্ষমতা খর্ব হবে না”।

এই আইনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পালিয়ে যাওয়া কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে থানাকে আদেশ দিলে সেটি তারা আমলে নিতে বাধ্য থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এ ধরনের সব ক্ষমতা ব্যবহার করে কিছুটা হলেও বিচারিক কর্তৃত্ব ফিরে পাবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।

ভেজালবিরোধী অভিযান, ইভটিজিং প্রতিরোধ, দুর্নীতিমুক্ত পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠান, সুষ্ঠু নির্বাচন ও জানমাল রক্ষায় দ্রুত বিচারে ২০০৯ সাল থেকে মোবাইল কোর্ট আইন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা হয়ে আসছে। বিচার বিভাগ আলাদা হবার পর থেকে মাঠে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়ে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অপরাধ আমলে নিতে না পারা এবং দোষ স্বীকার না করলে শাস্তি দিতে না পারায় মোবাইল কোর্ট কার্যত অনেকটাই বিফলে যাচ্ছিল।

মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকেন এমন একজন, বান্দরবন সদর থানার সহকারী কমশিনার (ভুমি) মোঃ মাহমুদুল হক বেনারকে বলেন, “মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর মূল স্পিরিট হচ্ছে কিছু অপরাধের তাৎক্ষনিক বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান ও প্রদর্শন করে অপরাধ প্রতিরোধ, নির্মূল ও নিরুৎসাহিত করা”।

তিনি আরো বলেন, “তবে এক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ করে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানে জুডিশিয়াস, সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। আর কেউ ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে আপীলের সুযোগ তো থাকছেই।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন