বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে, কমতে পারে প্রবৃদ্ধি অর্জন

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.06.26
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-economics বুধবার আঙ্কটাডের রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে,কমে যেতে পারে প্রবৃদ্ধিও। জুন,২০১৫
বেনার নিউজ

বাংলাদেশে গতবছর সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) চার দশমিক পাঁচ শতাংশ কমেছে। ২০১৪ সালে এদেশে নিট এফডিআই এসেছে ১৫৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ কোটি ডলার কম।

জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। যা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। তবে সরকারের দাবি সংস্থাটির প্রতিবেদনে বিদেশি বিনিয়োগের সঠিক চিত্র উঠে আসেনি।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড বুধবার ‘বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন-২০১৫’ শিরোনামে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জমি, অবকাঠামো, গ্যাস, পানি সংকটসহ মৌলিক কারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশে বিদেশি বিনিয়োগই শুধু নয় দেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈকি অস্থিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকেই দুষছেন।

বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত হারে এফডিআই না আসার পেছনে মূল কারণ হিসেবে  “অবকাঠামো সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা”কে চিহ্নিত করেন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী চৌধুরী।

এই উদ্যোক্তা বলেন, এসব কারণেই এদেশে প্রতি বছর এফডিআই গড়ে এক-দেড় বিলিয়ন ডলারের বৃত্তে আটকে আছে। আমাদের সকলের উচিৎ এসব সমস্যা দূর করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “সরকার স্বীকার না করলেও সত্য হল দেশে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ অনেক কম। অবকাঠামো, জমি পাওয়ার জটিলতা, বিদ্যুত, গ্যাস সংকট, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চতার কারণে দেশে সুস্থ্য বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। এরফলে, দেশি বিদেশি কোন বিনিয়োগকারীরাই বিনিয়োগ করছেন না। সবকিছুর আগে বিনিয়োগ পরিবেশ ঠিক করতে হবে। মনে রাখতে হবে দেশি বিদেশি সব ধরনের বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়”।

অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের কণ্ঠেও একই বার্তা শোনা যায়। তিনি বলেন, “সার্বিকভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ অনেক কম। এমনকি আমাদের চেয়ে ছোট দেশ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামের বিনিয়োগও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। মূল কথা, আমরা বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিনি। যার কারণে ব্যক্তিগত বিনিয়োগও কমে আসছে”।

বেনারকে তিনি আরো বলেন, “বিনিয়োগ কমে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। বিনিয়োগ না বাড়লে ৭ শতাংশ বা ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে স্বপ্ন দেখছে সরকার, তা অকালেই ঝরে যাবে। তাই সরকারের উচিত বিনিয়োগ জটিলতার অবসান করা”।

অবশ্য অর্থনীতিবিদদের এসব অভিযোগকে অস্বীকার করে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, “অবকাঠামো, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সরবরাহসহ মৌলিক বিষয়গুলোতে অনেক উন্নতি হয়েছে। আর বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বর্তমান সরকার যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি উদ্যোগ নিয়েছে”।

এদিকে আঙ্কটাডের প্রতিবেদন ‘ত্রুটিপূর্ণ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, “গত বছর দেশে এফডিআই এসেছে ২০৬ কোটি ডলার”।

তিনি বলেন, “এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে পুরো বিনিয়োগ চিত্র যথাযথভাবে ফুটে ওঠেনি। এখানে যেসব সূচক ধরে এফডিআই হিসাব করা হয়েছে এর বাইরেও অনেক বিনিয়োগ রয়েছে”।

আঙ্কটাড অবশ্য বলছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে মোট (গ্রস) এফডিআই ২০৬ কোটি ডলার আসলেও এর মধ্যে ৫৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বা উপকরণ দেশের বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ বছরজুড়ে অর্থ বাংলাদেশে খাটানো হয়নি। সেক্ষেত্রে নিট এফডিআই হয়েছে ১৫৩ কোটি ডলার।
জাতিসংঘের এই সংস্থাটির দেওয়া এফডিআই সংক্রান্ত সংজ্ঞায় বলা আছে, পুরো বছর ধরে যে অর্থ বা উপকরণ খাটানো হয়, সেটাই বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হবে। বছরের কিছু সময় লগ্নিকৃত থাকলে সেটা যোগ হবে না।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নাজনীন সুলতানা এ সংজ্ঞার বিরোধিতা করে বলেন, “বছরের অর্ধেক সময়ের জন্যও যদি অর্থ বা উপকরণ ব্যবহার হয়, তাহলে সেটা বিনিয়োগ বলে বিবেচিত হবে। সেক্ষেত্রে গত বছর দেশে মোট এফডিআই এসেছে ২০৬ কোটি ডলার”।

বুধবার প্রকাশিত আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৪ সালেই বাংলাদেশ প্রথম এফডিআই কমেছে। ২০১০ সালে এদেশে সরাসরি এফডিআই ছিল ৯১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ বেশি। ২০১১ সালে হয়েছে ১১৩ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২৪.৪২ শতাংশ বেশি। ২০১২ সালে হয়েছে ১২৯ কোটি ২৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৩.৭৫ শতাংশ।

সংস্থাটি বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে গত বছর ভারত, শ্রীলংকা ও মালদ্বীপে এফডিআই বেড়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে গত বছর এফডিআই ছিল ৩ হাজার ৪৪১ কোটি ডলার। এর আগের বছরের তুলনায় সেখানে এফডিআই বেড়েছে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি। এমনকি সহিংসতায় নাস্তানাবুদ পাকিস্তানেও এফডিআই চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। গত বছর এফডিআই ছিল ১৭৪ কোটি ডলার। যা এর আগের বছরের চেয়ে ৪৩ কোটি ডলার বেশি। অথচ সে তুলনায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবেশ যথেষ্ঠ স্থিতিশীল থাকলেও বাংলাদেশে এফডিআই কমেছে।

পাকিস্তানের মত দেশে বাড়লেও বাংলাদেশে কেন এফডিআই বাড়ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে বিনিয়োগ বোর্ডের (বিওআই) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. এসএ সামাদ বলেন, “বিনিয়োগকারীদের জন্য সব ধরনের প্রণোদনা বাংলাদেশে রয়েছে। বিওআইয়ে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুসহ অনলাইনে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্য অনেক জটিলতাই নিরসন করা হয়েছে। তার পরেও কেন কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসছে না, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না”।
তবে তিনিও আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে দুর্বলতা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, “এসব বিষয় তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হবে”।

বুধবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম ইসমাইল হোসেন আঙ্কটাডের এই প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৭২ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ এসেছে দেশের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং’ খাতে। এরপরেই রয়েছে ‘ট্রেড অ্যান্ড কমার্স’ খাতের বিনিয়োগ। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৩৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এছাড়া ট্রান্সপোর্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড কমিউনিকেশন খাতে এসেছে ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ।   

একক খাত হিসেবে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে বস্ত্র ও পোশাক খাতে, যা পরিমাণ ৩৯ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ডলার। এরপরেই রয়েছে ব্যাংকিং খাতের ৩১ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের বিনিয়োগ।

এই দুই খাতেই বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় কমেছে বলে আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এসব বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে উপার্জিত আয়কে পুনঃবিনিয়োগ করার মাধ্যমে। এভাবে বিনিয়োগ হয়েছে ৯৮ কোটি ৮৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার।

এছাড়া ‘ইক্যুইটি’ বা নিজস্ব মূলধন এসেছে ২৮ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার ডলারের। আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে এসেছে ২৫ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
এদিকে চলমান সংসদ অধিবেশনে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায়ও বিনিয়োগ কমার বিষয়টি উঠে আসে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ তার বক্তৃতায় বলেন, “বাংলাদেশে বিনিয়োগ বোর্ড বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অবকাঠামো সৃষ্টি ও নীতিমালা বাস্তবায়নে ‘চরমভাবে ব্যর্থ’ হয়েছে”।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরেই ঢালাওভাবে বিএনপি জামায়াতের রাজনৈতিক সহিংসতাকে দায়ি করা হয়। সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, বিএনপি এবং জামায়াতের কোন কারণ ছাড়া কর্মসূচি দেশের ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন