স্বাস্থ্যখাতে বাংলাদেশের উন্নতি, ভারতের চেয়ে এগিয়ে

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.06.22
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-health বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বেশ উন্নতি ঘটেছে, এগিয়ে আছে ভারতের চেয়ে। জুন,২০১৫
বেনার নিউজ

গত দুই দশক ধরে স্বাস্থ্যখাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভারতের তুলনায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। ভারতেরই একটি সরকারি  সংস্থার জরিপ দিয়েছে এমন তথ্য। এ সাফল্যের পিছনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ই অন্যতম কারণ বলছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা।

ভারতের জাতীয় পরিকল্পনা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা নীতি আয়োগ 'ভারতের স্বাস্থ্যখাত: বিদ্যমান অবস্থা ও সম্ভাবনার মধ্যে ফারাক' শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশটির স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতার বড় জায়গাগুলোও চিহ্নিত করতে গিয়ে বাংলাদেশের এ সাফল্যের কথা উল্লেখ করেছে।

এতে বলা হয়, গত ১০ থেকে ২০ বছরে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীন, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভিয়েতনামের মত উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে ভারত। অনেক মানদণ্ডে ভারত তালিকার একেবারে নিচের দিকে আছে। পোলিও দূরীকরণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। তবে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু এবং যক্ষ্মা, হামের মত সংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে অনেক ব্যর্থতা রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, যক্ষ্মা বা হামের মতো রোগের কারণে মৃত্যুর হার কমে আসার ফলে এ সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ।

বেসরকারী সংগঠন ব্রাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা প্রোগ্রামের কোঅর্ডিনেটর ড. রাইসুল হক বেনারকে বলেন, “সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সুন্দর সমন্বয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সরকারের এ খাতে উন্নয়ন কর্মকান্ড হাতে নিয়েছে সেগুলোকে গতিশীল রাখার কাজ করেছে বেসরকারী সংস্থা, এনজিওগুলো”।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, “স্বাস্থ্য সেবা ডিজিটাইলাজেশন হওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করে তোলার কারণে এমন অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশে শিশু ও মাত্রৃমৃত্যুর হার কমে আসা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের অন্যতম সূচক।”

তিনি বলেন, “প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবস্থা করেছে সরকার। যার সাহায্যে প্রান্তিক মানুষের দোর গোঁড়ায় পৌঁছে গেছে স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম। একইসঙ্গে দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং যেকোন দেশের তুলনায় চিকিৎসার খরচ কম রাখা এ খাতে উন্নয়নের অন্যতম কারণ।”  

বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের এই প্রাধ্যাক্ষও দাবি করেন, দেশের চিকিৎসা খাতে সরকারের সঙ্গে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দারুণভাবে সমন্বয় সাধন করে কাজ করে চলেছে।

আর স্বাস্থ্য সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেছেন, “মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ায় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রকল্পও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। সরকার চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মাতৃমৃত্যু-শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ, অপুষ্টিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি সাধিত হয়েছে । এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে একটি অনন্য উদারহরণ।”

এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান আছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে এসে ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন, “ভারত অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে থাকলেও তারা বাংলাদেশ  স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংক্রান্ত সূচকে বাংলাদেশের তুলনায় অত্যন্ত পিছিয়ে।”
এর জন্য তিনি ভারত সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে দায়ী করেন।  

অমর্ত্য সেন বলেন, “ভারত স্বাস্থ্য সমস্যাকে জটিল করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটি হয়নি। বাংলাদেশ গত এক দশকে এই খাতে ভাল উন্নতি করেছে। এদেশে আগের চেয়ে বর্তমানে শিশু মৃত্যুহার অনেক কমেছে। ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের দ্বিগুণ, কিন্তু বাংলাদেশের গড় আয়ু ভারতের চেয়ে বেশি।”

এদিকে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও এদেশের জনসংখ্যা বিচারে স্বাস্থ্য খাতে আরো অনেক উন্নয়ন বাকি আছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। যা কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে  স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের হার বাড়ানোর আহবান জানান তিনি।

ড. মোয়াজ্জেম বেনারকে বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়াটা আপেক্ষিক। গত বাজেটের তুলনায় পরিমান কিছুটা বাড়ানো হলেও সামগ্রিক বাজেটে যা দেওয়া হচ্ছে সে বিচারে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হার কমে যাচ্ছে। সে হিসেবে বলা যায়, এ খাতে বরাদ্দের প্রবৃদ্ধি আছে। কিন্তু তুলনামুলকভাবে কম। সামাজিক খাতের তুলনায় এখনো ভৌত অবকাঠেোগত খাতে বরাদ্দ বেশি রাখছে সরকার।”  

অবকাঠামো খাতের গুরুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনার সময়  এসেছে। কারণ, আগামী দিনে বাংলাদেশ গুণগত মানের প্রবৃদ্ধি আশা করছে। এর জন্য স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিকল্প নেই। ”
তিনি বলেন, “সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা মানবসম্পদ উন্নয়ন। সেটা বিবেচনায় নিলেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে। ”

নতুন অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে তা ছিল ১১ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার মোট বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ মাত্র ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ। অথচ বিদায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বরাদ্দ ছিল ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আবার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ একই রকম আছে, দশমিক ৭৪ শতাংশ। পাঁচ বছর আগেও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।

ব্রাকের গবেষক ড. রাইসুলও বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, যতটা অর্জনের কথা ততটা এখনো পারেনি বাংলাদেশ। এর জন্য সরকারকে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। ”




মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।