একের পর এক হত্যাকাণ্ড আর নতুন সংগঠনের নাম প্রকাশ

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.04.15
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-islamist চট্টগ্রামে বিপুল পরিমানে অস্ত্র সহ কথিত 'শহীদ হামজা ব্রিগেড' এর ৪ সদস্যকে গত ১২ এপ্রিল গ্রেফতার করে র‍্যাব। ছবিঃ ১২ এপ্রিল,২০১৫
বেনার নিউজ

আরও একটি জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে র্যাব। তাদের দাবি ২৫ সদস্যের সংগঠনটির নাম ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ (এসএইচবি)। যাদের ২৪ জনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তাঁদের কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে । তবে এই সংগঠনের উদ্দেশ্য কী, মূল নেতা কে তা জানায়নি র্যাব। তাঁরা শুধু জানিয়েছে, সাবেক কয়েকজন শিবিরকর্মী ও কওমি মাদ্রাসার ছাত্র মিলে ২০১৩ সালে এই সংগঠনটি গড়ে তোলে।

এ নিয়ে গত দুই বছরে অন্তত চারটি জঙ্গি সংগঠনের নাম শোনা গেল। তবে এসব সংগঠন নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যাচ্ছে না। কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পরে এসব জঙ্গি সংগঠনের নাম শোনা গেছে।

পুলিশ-র্যাব বা অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নতুন নতুন সংগঠনের নাম শোনালেও এদের সম্পর্কে বিস্তরিত কিছু বলছে পারছে না।

২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে হামলার শিকার হন ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন। হামলাকারীরা পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে ও পিঠে কুপিয়ে ফেলে যায়। মারাত্মক আহত হলেও তিনি বেঁচে যান।

এর এক মাস পর আরেক ব্লগার রাজীব হায়দারকে রাজধানীর পল্লবীতে একই কায়দায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তে বেরিয়ে আসে রাজীব হত্যায় ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামে নতুন একটি জঙ্গি সংগঠন জড়িত।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আনসারুল্লাহর প্রধান মুফতি মুহাম্মদ জসীম উদ্দিন রাহমানীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। মামলাটি এখন বিচারাধীন।

এরপর গত বছরের (২০১৪ সালের) নভেম্বরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ইসলাম লিলন হত্যার পরে ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ- ২’ নামে একটি সংগঠনের ফেসবুক পাতায় হত্যার দায় স্বীকার করা হয়। ফেসবুকের ওই বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের মুজাহিদীনরা আজকে রাজশাহীতে এক মুরতাদকে কতল করেছেন যে তার ডিপার্টমেন্টে ও ক্লাসে বোরকা পরা নিষিদ্ধ করেছিল’।

ওই একই সংগঠনের ফেসবুক পেজে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার ও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আশরাফুল ইসলামকে হত্যার দায়ও স্বীকার করা হয়। তবে ছয় মাসেও পুলিশ ওই সংগঠনটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেনি। এটি আনসারউল্লাহ বাংলা টিম বা একই আদর্শের অনুসারী অন্য কোনো সংগঠন হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

এরপর গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যার দুই ঘণ্টা পরেই দায় স্বীকার করে ‘আনসার বাংলা সেভেন’ নামের একটি আইডি থেকে টুইট করা হয়। আনসার বাংলা সেভেন নামের ওই সংগঠনটির অস্তিত্ব আদৌ আছে কী না সে বিষয়ে পুলিশ এখনো বিশেষ কিছু জানাতে পারেনি।

সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ রাজধানীতে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান হত্যা মামলায় পুলিশ তিন জনকে গ্রেপ্তার করে দফায় দফায় রিমান্ডে নিলেও তারা আসলে কোন সংগঠনের সদস্য তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজনকে ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়।

“ওয়াশিকুর হত্যায় জড়িতরা কোন সংগঠনের সদস্য তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে এরা আনসারউল্লাহ বাংলা টিম বা একই মতাদর্শের কোনো জঙ্গি সংগঠনের স্লিপার সেলের সদস্য,” বেনারকে জানান এই দুটি মামলার তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম।

তিনি জানান, ব্লগার ওয়াশিকুর ও লেখক অভিজিৎ রায়কে একই ভাবে খুন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অভিজৎ হত্যার সঙ্গে গ্রেপ্তার তিনজনের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

এর আগে ডিবি জানিয়েছিল জসীমউদ্দীন রাহমানী আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান। তিনি ধরা পড়ার পরেও এই সংগঠনের তৎপরতা চালু আছে।

এসব বিষয়ে ঢাকা মহানগর ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, জসীমউদ্দীনের পরে আনসারউল্লাহর হাল ধরেছেন তামিম আল আদনানী। তাকে খুঁজছে গোয়েন্দারা।

আরো নতুন সংগঠন!: গত ১২ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে তিনজন জঙ্গি ও একজন অস্ত্র সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে ০৫টি একে-২২, ০৫টি বিদেশী পিস্তল, ১০টি একে-২২ এর ম্যাগাজিন, ০৫টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ০১টি এসবিবিএল বন্দুক, ০১টি এলজি, ৩৬৬৮ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকারের গুলি ( ৩১৫৫ রাউন্ড .২২ বোরের গুলি, ৫০১ রাউন্ড শর্টগানের গুলি, ১২ রাউন্ড ৭.৬৫ পিস্তলের গুলি) উদ্ধার করা হয়।

এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি হাটহাজারী সদরের মাদরাসাতুল আবু বকরে অভিযান চালিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ধর্মীয় বইসহ জঙ্গি সন্দেহে ১২ জনকে আটক করা হয়। রিমান্ডে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ ফেব্রুয়ারি বাঁশখালীর লট মণি পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে অস্ত্র-গুলিসহ পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

“২০১৩ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রামের ফয়’স লেক এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় বসে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘শহীদ হামজা ব্রিগেড’ গঠন করে জঙ্গিরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে কলেজ ও মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রদের এই সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। পরে তাদের পাহাড়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, টেলিফোনে বেনারকে জানান র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ।

তাদের কাছ থেকে ছয়টি একে ২২ রাইফেল, ছয়টি পিস্তলসহ সাড়ে সাতশ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ ফেব্রুয়ারি হালিশহর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম, ৭৬টি হাতবোমাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এরপর ১২ এপ্রিলের অভিযান চালানো হয়। এসব জঙ্গিদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের র্যাব জানতে পারে, শহীদ হামজা ব্রিগেড নামে জঙ্গিরা নতুন একটি সংগঠন করেছে। তাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। তারা কোনো ঘটনা ঘটিয়েছে কী না তা এখনো জানা যায়নি।

“রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নৈতিকতা ফিরে না এলে দুটি ঘটনা অবধারিত। একটি হলো- সন্ত্রাসীরা তাদের অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নত করবে। আরেকটি হলো ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটবে, এ ধরণের গ্রুপের সংখ্যা বেড়ে যাবে,” বেনারকে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শহীদুজ্জামান।তাঁর মতে, এটাকে ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাময়িক টুল হতে পারে। কিন্তু প্রকৃত (দীর্ঘমেয়াদে) সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নৈতিকতা আনতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।