শুরু হচ্ছে মেট্রোরেলের কাজ, রুট নিয়ে চলছে বিতর্ক

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.01.15
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-metro মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বেনার নিউজ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আর যানজট এখন যেন সমার্থক শব্দ। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি মানুষের কর্মঘণ্টা। যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার নির্মাণ থেকে শুরু করে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তবে এবার রাজধানীবাসীর জন্য নতুন চমক ‘মেট্রোরেল’ নিয়ে হাজির হয়েছে সরকার। চলতি বছরই শুরু হচ্ছে এর কাজ।

‘স্বপ্নের’ এই প্রকল্প নিয়ে কারো দ্বিমত না থাকলেও প্রস্তাবিত রুট নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছে। মেট্রোরেলের রুটটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে যাওয়ায় এ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সৌন্দর্যহানি আর অতিরিক্ত শব্দদূষণের অভিযোগ এনে আপত্তি তুলেছে দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা। প্রত্নতাত্ত্বিক এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরাও। তবে সে অভিযোগ আমলে না নিয়ে শীঘ্রই নির্ধারিত রুটে মেট্রোরেল নির্মানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।


প্রকল্প খরচ ২২ হাজার কোটি টাকা

সরকারি সূত্রে জানা যায়, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক এ নির্মানের খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দিতে সিম্মত হয়েছে জাপানের রাষ্ট্রায়ত্ত উন্নয়ন সংস্থা, জাইকা। আর  বাকি ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার।  আগামী  ২০১৯ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।


সময় বাঁচবে- আশা রাজধানীবাসীর

প্রকল্পসূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত রুটের রাস্তার মাঝ বরাবর উপর দিয়ে মেট্রোরেল চলাচল করবে। উত্তরা থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-ফার্মগেইট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল করবে মোট ২৪ জোড়া মেট্রোরেল। বর্তমানে মিরপুর বা উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে যেখানে প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টার মত লেগে যায়, মেট্রোরেলে সেখানে মাত্র ৪০ মিনিটে পৌছানো যাবে। আছে একসঙ্গে অধিক যাত্রী বহনের সুযোগও।

মেট্রোরেল প্রকল্প পরিচালক মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, মোট ২৪টি মেট্রোরেল চলাচল করবে। এর প্রতিটিতে ৬টি করে কোচ থাকবে। যার প্রতি স্কয়ার মিটারে ৮ জনের হিসাবে ব্যস্ততম সময়ে ১৮০০ যাত্রী চলাচল করতে পারবে। আর মাত্র চার থেকে পাঁচ মিনিট পরপরিই চলবে এই মেট্রোরেল।

এদিকে মেট্রোরেল নির্মানের কাজে উচ্ছ্বসিত বেশিরভাগ রাজধানীবাসী। কম সময়ে অধিক যাত্রী বহন করায় যানজটমুক্ত শহরের পাশাপাশি মূল্যবান সময় বাঁচবে বলে আশা করছেন তারা।


মেট্রোরেলের রুট

সর্বশেষ নির্ধারিত রুট অনুযায়ী উত্তরা থেকে শুরু হয়ে মিরপুর-ফার্মগেইট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যাবে এই মেট্রোরেল। যার ১৬টি স্টেশন হবে। এগুলো হল: উত্তরা (উত্তর), উত্তরা (সেন্টার), উত্তরা (দক্ষিণ), পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেইট, সোনারগাঁও, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, জাতীয় স্টেডিয়াম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক এলাকায়।

এর আগে ২০১১ সালে নভোথিয়েটারের পাশ দিয়ে ফার্মগেট হয়ে মেট্রো রেললাইনের রুট নির্ধারণ করা হলে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আপত্তি তোলে বিমানবাহিনী। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এই রুট নির্ধারণ করা হয়। তবে নির্ধারিত এই রুটটির একটি অংশ পেড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর।

ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন স্থানে চালানো ভূ-তাত্ত্বিক জরিপও শেষ হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলেও এ সিদ্ধান্ত মানতে রাজি নয় শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত দূষণ থেকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রেখে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ সমুন্নত রাখতে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের জিন প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, অণুজীব বিজ্ঞান ও সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ বিভাগ পড়বে সরাসরি হুমকিতে। বহু বছরের পুরনো ঢাকা গেইট ও রাজু ভাস্কর্যও তার সৌন্দর্য হারাবে। তাছাড়া  ট্রেনের শব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থগার ও বিজ্ঞান লাইব্রেরিতে পড়ালেখা এবং ক্যাম্পাস এলাকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হবে। হুমকির মুখে পড়বে চারুকলা ইস্টিটিউট থেকে বের হওয়া বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভা যাত্রা।

এ বিষয়ে রাজু ভাস্কর্যের  ভাস্কর  শ্যামল সরকার বেনারকে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বহু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসের বুক চিরে মেট্রোরেল গেলে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মধ্যে পড়বে। তাই  মেট্রোরেলের রুট তা পরিবর্তনের  কোন বিকল্প নেই।”

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নাজমুল হোসেন বেনারকে বলেন, “আমরা দেশের উন্নয়ন চাই। যানজটমুক্ত রাজধানী চাই। আর সে কারণে মেট্রোরেলের বিকল্প নেই। কিন্তু সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দিয়েই কেন হতে হবে? অতিরিক্ত শব্দ দূষণ এবং যাত্রীদের ভিড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। হুমকির মুখে পড়বে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার নানা সংস্কৃতি।”

রুট পরিবর্তনের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের’ ব্যানারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন কয়েকশ শিক্ষার্থী। এতে সংহতি জানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকও।


অনঢ় অবস্থানে সরকার

তবে প্রস্তাবিত রুটেই মেট্রোরেল নির্মানের ব্যাপারে অনঢ় সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অভিযোগের ভিত্তি নেই উল্লেখ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এখন আর মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তন করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

শুক্রবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে  সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “অর্থসংস্থান ও কাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় আর ফিরে আসারও সুযোগ নেই।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে মেট্রোরেলের নকশা করা হয়েছে। আগামী মার্চ মাসেই মেট্রোরেলের মূল কাজ শুরু হবে। এখন মেট্রোরেলের পথ পরিবর্তনের সুযোগ নেই।”

তিনি বলেন, “জাতীয় সংসদ ভবন, প্রেস ক্লাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর স্থানে মেট্রোরেল সাউন্ড প্রুফ করা রয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মেট্রোরেল বাধা সৃষ্টি করবে কেন? আমি অনুরোধ করবো এ নিয়ে আর বাদানুবাদ না করার।”


বিরোধিতাকারীদের সমালোচনায় প্রধানমন্ত্রীও

খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের দাবি তোলা শিক্ষার্থীদের সমালোচনা করেছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, এখন নকশা পরিবর্তন করতে গেলে পুরো প্রজেক্টটা নষ্ট হবে। যাদের কাছ থেকে আমরা অর্থ ধার নিচ্ছি তারা অর্থ দেওয়া বন্ধ করে দেবে। আর উন্নয়নটা হবে না। ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ।

উন্নয়ন বন্ধ করাই এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য- মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, “হঠাৎ দেখি একটা আন্দোলন। এটা তো হঠাৎ করে না, কয়েক বছরের কাজ।এটাকে বাধাগ্রস্ত করা মানে এর কাজ মুখ থুবড়ে পড়বে।”

পড়ালেখা বিঘ্ন হওয়ার শঙ্কা নাকচ করে শেখ হাসিনা বলেন, “আধুনিক প্রযুক্তির সাউন্ড সিস্টেম কন্ট্রোল করা হবে। সে জ্ঞানও তাদের নেই। সে খবরটাও তারা রাখেন না। লেখাপড়ার ইচ্ছা থাকলে মানুষ সুযোগ করে নেয়। আর, যদি ইচ্ছা না থাকে, তাহলে ছুতা অনেক পাওয়া যায়। পড়ার ইচ্ছা থাকলে পড়া যায়। ট্রেনে চলতে চলতে তো মানুষ পড়ে”।

শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মচারীদের কথা চিন্তা করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে এই লাইন দেওয়া হয়েছে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরোধিতা থেকে সরে আসার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমার উন্নয়নের কাজে কেউ দয়া করে বাধা দেবেন না।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।