নয় জঙ্গির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন,সাতজনের পরিচয় প্রকাশ

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.07.27
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
20160727-Militants-ID620.jpg ঢাকা মহানগর পুলিশ গতকাল বুধবার রাতে নিহত সাত জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ করে। জুলাই ২৭, ২০১৬।
ঢাকা মহানগর পুলিশ

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গতকাল বুধবার রাতে নিহত সাত জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ করেছে। নিহতদের একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। ঢাকার তিনজন ছাড়াও নিহতদের তালিকায় আছেন দিনাজপুর, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা ও নোয়াখালীর বাসিন্দারা।

গত সোমবার দিবাগত রাতে ঢাকার কল্যাণপুরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নয় জঙ্গি নিহত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। বুধবার দুপুরে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন,পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে তবেই জঙ্গিদের পরিচয় প্রকাশ করা হবে। এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় পুলিশ সাত জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ করে।

মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় নয় জঙ্গির লাশ মর্গে এলেও ময়নাতদন্ত হয় গতকাল বুধবার। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদের নেতৃত্বে একটি দল ময়নাতদন্ত করেন।

ময়নাতদন্ত শেষে সোহেল মাহমুদ বেনারকে বলেন, “নয় জঙ্গিরই মৃত্যু হয়েছে গুলিতে। প্রত্যেকের শরীরে সাত-আটটি করে গুলির জখম আছে। বুকে, পিঠে, হাতে-পায়ে ও মাথায় গুলি লেগেছে। তবে বেশির ভাগ গুলি লেগেছে পেছনে।”

তিনি আরও বলেন, জঙ্গিরা কোনো উত্তেজক সেবন করত কি না, তা খতিয়ে দেখতে মহাখালীর রাসায়নিক পরীক্ষাগারে ভিসেরার নমুনা পাঠানো হচ্ছে। তাদের ডিএনএ নমুনা, চুলও সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রয়োজনে এই নমুনা এফবিআইকে দেওয়া হতে পারে।

সাত জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ

ঢাকার তিন বাসিন্দা হলেন, শেহজাদ রউফ ওরফে অর্ক, তাজ-উল-হক রাশিক ও আকিফুজজামান খান।

শেহজাদ রউফ অর্ক মার্কিন নাগরিক। তিনি তার বাবা তৌহিদ রউফের সঙ্গে বসুন্ধরার সি ব্লকের একটি ১০ তলা ভবনে থাকতেন।

গত ৩ ফেব্রুয়ারী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে। নিখোঁজ হওয়ার তিন দিনের মাথায় পরিবারের পক্ষ থেকে ভাটারা থানায় একটি জিডি করা হয়।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শেহজাদ ছিল নিবরাজ ইসলামের বন্ধু। একই দিনে অর্ক, নিবরাস ও তাদের আরেক বন্ধু তাওসিফ হোসেন বাড়ি ছাড়ে।

গতকাল বুধবার বিকেলে শেহজাদের বাবা তৌহিদ রউফ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে যান। লাশটি ছেলের কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত নন বলে জানান।

“আমরা লাশ দেখেছি। চেহারায় পুরোপুরি মিল নেই। ডিএনএ টেস্টের প্রয়োজন রয়েছে,” বেনারকে জানান তৌহিদ রউফ।

ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকেরা বলেন, শেহজাদের বাবা জানান তাঁর ছেলের নাকে তিল আছে এবং কানটা একটু বাঁকা। এই লাশেরও তা রয়েছে। তবে ছেলেটি এত রুগ্ন ছিল না বলে জানান তিনি।

ঢাকার তাজ-উল-হক রাশিকের বাড়ি ধানমন্ডিতে। তার বাবার নাম রবিউল হক। সূত্রগুলো বলছে, চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা বলে গত এপ্রিলে তাজ-উল-হক রাশিক বাড়ি ছাড়েন।

আকিফুজ্জামান খানের বাড়ি গুলশানে। তার বাবার নাম সাইফুজ্জামান খান। তার্কিশ হোপ স্কুলে নিবরাসের সহপাঠী ছিল এই আকিফ।

নিহতদের তালিকায় থাকা নোয়াখালীর জোবায়ের হোসেন গত ২৫ মে রাতে নিখোঁজ হয়। তাদের গ্রামের বাড়ি সুধারাম থানার পশ্চিম মাইজদিতে। জোবায়েরের বাবা আব্দুল কাইয়ূম ১২ জুলাই সুধারাম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

নোয়াখালী সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র জোবায়ের ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানা যায়। পরিবারের সদস্যরা জানান, জোবায়েরের বিরুদ্ধে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মামলা রয়েছে।

নোয়াখালী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. ইলিয়াছ শরীফ বেনারকে বলেন, “জোবায়ের বিষয়টি তাঁদের সন্দেহের মধ্যে ছিল। সেভাবেই তাঁরা খোঁজখবর নিচ্ছিলেন।”

এর বাইরে নিহত আবদুল্লাহর বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের বল্লভগঞ্জ গ্রামে। আগে তার নাম ছিল মোতালেব। দিনাজপুরের হাকিমপুর এতিমখানায় কওমি মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার পর তার নতুন নাম হয় আবদুল্লাহ। গত এক বছররে বাড়িতে যায়নি আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহর বাবার নাম মো. সোহরাব আলী। গোটা পরিবার জামায়াতে ইসলামির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে আবদুল্লাহর ভাই নূর ইসলাম বলেন, “ওর লাশ আমরা নেব না। আমরা ওর কর্মকাণ্ড সমর্থন করি না।”

আরেক নিহত মো. মতিয়ার রহমানের বাড়ি সাতক্ষীরায়। বাবার নাম নাসিরউদ্দীন সরকার। নাসিরউদ্দীন বেনারকে বলেন, “ছেলে বছরখানেক ধরে বাড়ি আসেনি। ফোনে বলেছে, সে সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। খালার বাসায় থাকে।”

আবু হাকিম নাইমের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায়। তার বাবার নাম নুরুল ইসলাম।

গতকাল এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বাকি দুজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

রিমান্ডে বাড়ির মালিকের স্ত্রী

কল্যাণপুরের ‘তাজ মঞ্জিল’ নামের বাড়ির মালিক আতাহার উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী মমতাজ পারভীনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন আদালত। ঢাকার মহানগর হাকিম নূর নাহার ইয়াসমিন এ আদেশ দেন।

মমতাজ পারভীনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন মিরপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক বজলুর রহমান।

আবেদনে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই না করে আসামি বাড়ি ভাড়া দিয়েছেন। পুলিশের কাছে ভাড়াটের তথ্য দেননি। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

উল্লেখ্য, গতকাল বুধবারও কল্যাণপুরের যে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেটি পুলিশ ঘিরে রাখে। মঙ্গলবার কল্যাণপুরের সব স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও বুধবার সব প্রতিষ্ঠানই ছিল খোলা। কেবল জাহাজ বিল্ডিং সংলগ্ন শিশু কল্যাণ কেজি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলটি বন্ধ ছিল।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।