একদিকে জঙ্গি সন্ত্রাস, অন্যদিকে র‍্যাব–পুলিশের অভিযান

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.12.28
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-militants গাজীপুরে একটি বাড়িতে অভিযানকালে বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম বের করেন র‍্যাব সদস্যরা।
বেনার নিউজ

ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর গাজীপুরে একটি ‘জঙ্গি আস্তানায়’ র‍্যাবের অভিযানে দুজন নিহত হয়েছেন। গাজীপুরে ভোগড়া বাইপাস সড়কের কাছে জুগিতলার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে রোববার মধ্যরাতে এই অভিযান শুরু হয়।

অভিযানে যে দুই ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছেন, তাদের পরিচয় র‍্যাব কিংবা পুলিশ কেউই সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জানাতে পারেনি। লাশ দুটি শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ মর্গে রয়েছে।

গত চার দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজিপুরে সন্ধান পাওয়া তিনটি জঙ্গি আস্তানাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ—জেএমবির বলে জানিয়েছে পুলিশ ও র‍্যাব।

গত কয়েক দিনে র‍্যাব–পুলিশের এসব অভিযান যেমন চলেছে, তেমনি জঙ্গি তৎপরতাও বহাল ছিল। ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবার রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্নঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছে।

গাজীপুরে রোববার মধ্যরাতের অভিযানের ২৪ ঘণ্টা আগে শনিবার গভীর রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারির একটি বাসায় অভিযান শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ।সেখান থেকে রাইফেল, বিস্ফোরক, গুলি ও সেনাবাহিনীর পোশাক উদ্ধার করা হয়।

তার আগে গত বৃহস্পতিবার প্রায় ১৪ ঘণ্টা মিরপুরের শাহ আলী থানার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তিন জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ১৬টি ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’, ‘সুইসাইড ভেস্ট’ ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ।


গাজীপুরের অভিযান

গাজীপুরে রোববার মধ্যরাতের অভিযানে দুজন নিহত হওয়ার পর কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মাহবুবুল আলম (৩০) ও মিনহাজুল (২৫) নামে এই দুজনের মারা যাওয়ার খবর এসেছিল ।

গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে এই দুজন গত রোববার দুপুরে ছাড়া পাওয়ার পর তাদের র‍্যাব তুলে নিয়ে গিয়েছিল বলে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

এরপর মধ্যরাতে ভোগড়া বাইপাস সড়কের কাছে যোগীতলায় র‍্যাবের অভিযানে দুজন নিহত হলে মাহবুব ও মিনহাজকে নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল।

গতকাল সোমবার খোঁজ নিয়ে জানা যায়, র‍্যাব ধরে নিলেও তাদের ছেড়ে দিয়েছে। মাহবুব রয়েছেন গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার পূর্ব এনায়েতপুরে তার বাড়িতে। মিনহাজও সন্ধ্যায় পৌঁছে যান বগুড়ার শেরপুরে তার বাড়িতে।

অভিযান সম্পর্কে র‍্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, “নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের কয়েকজন সেখানে মিলিত হয়ে নাশকতার পরিকল্পনা করছিল বলে র‍্যাবের কাছে খবর ছিল।”

“অভিযানের সময় বাড়ির ভেতর থেকে র‍্যাবকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালানো হয়। এরপর র‍্যাব সদস্যরা পাল্টা গুলি করে।”

এখানে কি দুজনই ছিল- সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মাহমুদ বলেন, “আমাদের সদস্যরা চারপাশ ঘিরে রেখেছিল। কারও পালানোর সুযোগ ছিল না।”

‘জঙ্গিদের ছোড়া বোমায়’ র‍্যাবের এক সদস্য আহত হন বলে মুফতি মাহমুদ জানান। তবে তাকে ঘটনাস্থলে দেখতে পাননি সাংবাদিকেরা।

এ প্রসঙ্গে মাহমুদ বলেন, “স্প্লিন্টারে আহতকে চিকিৎসার জন্য আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

টেলিভিশনের ছবিতে দেখা যায়, একটি প্লটের এক কোনায় আস্তরহীন লাল ইটের তৈরি একটি ঘর ঘিরে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন র‍্যাব সদস্যরা। ঘরটিতে জানালাও নেই। দরজা ছিল, তা খোলা। ভেতরে পড়ে ছিল লাশ দুটি।

র‍্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলকে ঘরটির ভেতরে-বাইরে তল্লাশি চালাতে দেখা যায়। ঘরটি থেকে জেএমবির বিভিন্ন পুস্তিকাসহ বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামও বের করেন র‍্যাব সদস্যরা।

মুফতি মাহমুদ জানান, ঘরের ভেতরে তিনটি বোমা এবং একটি পিস্তল ও পাঁচ রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়।

ঘরের বাইরের জমিতে পাওয়া একটি ব্যাগ থেকে বোমা তৈরির বিপুল সরঞ্জাম ও জেএমবির কাগজপত্র পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।


চট্টগ্রামে জেএমবির আস্তানা

চট্টগ্রামের এক বাসায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির আস্তানার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ; সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে স্নাইপার রাইফেল, বিস্ফোরক, গুলি ও সেনাবাহিনীর পোশাক।

হাটহাজারি থানার আমান বাজার এলাকায় হাজী ইছহাক ম্যানসন নামের ওই দুই তলা বাড়ির নিচতলায় গত শনিবার রাত দেড়টা থেকে রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত অভিযান চালায় র‍্যাব।

গত ৫ অক্টোবর খোয়াজনগর এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার জেএমবি সদস্যদের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে নাহিম, রাসেল ও ফয়সাল নামে ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী তিন যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।

“এদের মধ্যে রাসেলের কাছ থেকে আমরা ওই আস্তানার সন্ধান পাই। পরে তাদের নিয়ে সেখানে অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক, গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম পাওয়া যায়,” সাংবাদিকদের জানান নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর-দক্ষিণ) বাবুল আক্তার।

এর মধ্যে একটি এমকে-১১ স্নাইপার রাইফেল, ২৫০টি গুলি, দুটি ম্যাগজিন, পাঁচ কেজি জেল এক্সপ্লোসিভ, ১০টি ডেটোনেটর, সেনাবাহিনীর ১২ সেট পোশাক, এক জোড়া মেজর পদের র‍্যাংক ব্যাচ এবং বোমা তৈরির  বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে।

অভিযানে থাকা গোয়েন্দা পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের এসআই সন্তোষ চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি স্নাইপার রাইফেলটি অত্যাধুনিক। চট্টগ্রামে এ ধরনের রাইফেল এর আগে আর উদ্ধার হয়নি।”

রোববার রাতে অস্ত্র আইনে একটি এবং বিস্ফোরক আইনে আরেকটি মামলা হয় বলে হাটহাজারি থানার ওসি মো. ইসমাইল জানিয়েছেন। দুটি মামলাতেই চারজনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনের সঙ্গে আসামির তালিকায় রয়েছেন জেএমবির কমান্ডার মো. ফারদিন। তিনি পলাতক।

গ্রেপ্তার তিনজন হলেন- নাইমুর রহমান নয়ন (২৫), ফয়সাল মাহমুদ (২৬) ও শওকত রাসেল (২৬)। তিনজনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে পুলিশের দাবি।


আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা

ধর্মীয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবার রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে বোমা হামলা চালিয়েছে। এ নিয়ে দেশে গত চার মাসে ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর ১৯টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে হিন্দুদের মন্দির, খ্রিষ্টান ধর্মযাজক, বাহাই, শিয়া ও আহমদিয়া সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হয়েছে।

গত শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে হামলায় অজ্ঞাতনামা এক যুবক নিহত হয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত তাঁর পরিচয় মেলেনি। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আটজন মুসল্লি।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ নওশাদ আলী সাংবাদিকদের বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিহত ব্যক্তির শরীরে থাকা অবস্থায় বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে।

এটা আত্মঘাতী হামলা কি না, তা এখনো নিশ্চিত নন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “নিহত যুবক স্থানীয়ভাবে তৈরি ‘সকেট বোমা’ ব্যবহার করেছেন। তবে এটা আত্মঘাতী বোমা হামলা কি না, তা তদন্তের আগে বলা যাবে না।”

এদিকে এ ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে দায় স্বীকার করেছে। জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট সাইট (এসআইটিই) গতকাল এ তথ্য জানিয়েছে।

সাইট জানিয়েছে, আইএসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলাকারীর নাম “আবু আল ফিদা আল-বাঙালি”। সে তার শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক বেল্ট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এ হামলা চালায়।’


ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর আরও ১৮ হামলা

দেশে নতুন মাত্রায় হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এর পাঁচ দিনের মাথায় ৩ অক্টোবর একই কায়দায় রংপুরে জাপানি নাগরিক কোনিও হোশিকে হত্যা করা হয়।

এরপর ৪ অক্টোবর ঈশ্বরদীতে খ্রিষ্টান যাজক লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা, পরদিন ঢাকায় খিজির খানকে তাঁর খানকায় জবাই করে হত্যা, ২৩ অক্টোবর রাতে ঢাকায় শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে হোসেনি দালানে বোমা হামলা, ৩১ অক্টোবর আজিজ মার্কেটে প্রকাশক ফয়সাল আরেফিনকে হত্যা এবং একই দিন লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশককে হত্যার চেষ্টা, ৪ নভেম্বর দিনাজপুরে ইতালীয় ধর্মযাজককে, ৮ নভেম্বর রংপুর শহরে বাহাই কেন্দ্রের পরিচালক রুহুল আমিন ও ১২ নভেম্বর সৈয়দপুরে প্রতীকী কারবালায় শিয়া সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

এর আগে ১০ নভেম্বর রংপুরের কাউনিয়ায় এক মাজারের খাদেমকে হত্যা করা হয়। ২৬ নভেম্বর বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা হয়। এরপর ৩০ নভেম্বর দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে ইস্কন নেতা বীরেন্দ্র নাথকে হত্যার চেষ্টা, ৪ ডিসেম্বর কাহারোলে কান্তজিউ মন্দিরের প্রাঙ্গণে রাসমেলায় যাত্রাপালায় বোমা হামলা, ১০ ডিসেম্বর একই উপজেলায় ইস্কন মন্দিরে হামলা, একই রাতে চুয়াডাঙ্গায় সাধু সংঘের এক বাউলকে হত্যা এবং ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঘাঁটি ঈশা খাঁর দুটি মসজিদে জুমার নামাজে বোমা হামলা।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন