মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে খালেদার প্রশ্নে বিষ্মিত অনেকেই

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.12.23
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-mukti মুক্তিযুদ্ধে শহীদ​দের স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিল্পকর্ম তৈরি করছেন শিল্পী মিন্টু দের নেতৃত্বে (মাঝখানে) একদল তরুণ। ১২ ডিসেম্বর ২০১৫
বেনার নিউজ

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলায়, তা দেশের রাজনীতিতে নতুন সমালোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি এমন সময় এই প্রশ্ন তুলেছেন যখন বিজয়ের মাস ডিসেম্বর চলছে।

গত সোমবার ঢাকায় এক মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, “আজকে বলা হয় এত লাখ লোক শহীদ হয়েছে। এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।”

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন বলে তথ্য প্রচলিত রয়েছে। এটা কেউ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে দেখেনি, গুণে দেখারও উদ্যোগও নেয়নি কোনো সরকার।

স্পর্শকাতর এ বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুললেন খালেদা জিয়া, যিনি এ দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও যাঁর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান।

“একাত্তরে শহীদের সংখ্যা নিয়ে এত দিন বিতর্ক করছে পরাজিত পাকিস্তানি জেনারেল এবং দেশটির এক শ্রেণির লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক। কিন্তু বাংলাদেশের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি এমন প্রশ্ন তোলেননি,” জানান প্রবীণ বাম রাজনীতিবিদ হায়দার আকবর খান রনো।

তিনি বলেন, পাকিস্তান সরকারের হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে গণহত্যার কথা উল্লেখ আছে, যদিও সংখ্যাটি সেখানে অনেক কম দেখানো হয়।

একাধিক মুক্তিযোদ্ধা জানান, যে প্রশ্ন এত দিন পাকিস্তানিরা তুলেছে, যে সংশয় পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীর মদদপুষ্ট গবেষকেরা প্রকাশ করছেন, সেই প্রশ্ন ও সংশয় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির নেত্রীর মুখে একেবারেই শোভা পায় না।

“সেদিন মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অযাচিত প্রশ্নটি খালেদা জিয়া তুলেছেন, সেটি আশা করি তিনি প্রত্যাহার করে নেবেন এবং শহীদ পরিবারের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করবেন,” বেনারকে জানান মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক আর কে চৌধুরী।

অবশ্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা হাফিজউদ্দিন আহমদ বিবিসির সঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, “খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে নিজে কোনো মন্তব্য করেননি। বিতর্ক আছে—সেটিই শুধু উল্লেখ করেছেন মাত্র।”

শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

“তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে মুক্তিযুদ্ধ হতো না,” সমাবেশে উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া।

খালেদা একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে সবাইকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে সত্যিকারে যারা সাধারণ মানুষকে অত্যাচার করেছিল, বিএনপি তাদের বিচার চায়। কিন্তু সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানসম্মত ও স্বচ্ছ।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সম্মান দেয়নি—এমন মন্তব্য করে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ নিজের ঘরে যুদ্ধাপরাধী পালছে, মন্ত্রী বানাচ্ছে। তাঁদের আত্মীয়স্বজনের অনেকে রাজাকার। তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রসঙ্গে কথা তোলেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, “সরকার নানারকম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরি করছে। যাদের অন্যায়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে; আমরা ক্ষমতায় আসলে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করে তাদের যথাযথ সম্মান ও সম্মাননা দেব।”

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খালেদা জিয়ার এই বক্তব্য নিয়ে বেশ প্রতিক্রিয়া রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্যে। তাঁদের মতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কিংবা সরকারের ওপর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাগ, ক্ষোভ ও হতাশা থাকার হাজারটা কারণ থাকতে পারে । তিনি তাঁর সেই রাগ, ক্ষোভ কিংবা হতাশার কথা জনগণকে জানাবেন, তাতে দোষের কিছু নেই।

কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন বিজয়ের মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন না।

এর আগে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর বিভিন্ন লেখায় মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বাংলাদেশে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিড বার্গম্যান, যিনি ব্লগ লিখে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে প্রচার চালান । আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অবমাননার দায়ে শাস্তি পেয়েছিলেন তিনি।

বাংলাদেশে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ নারী ধর্ষিত হওয়ার তথ্যের ‘কোনো ভিত্তি নেই’ বলে বার্গম্যান তার লেখায় দাবি করেছিলেন।

“মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা, শহীদের সংখ্যা ও ধর্ষিত নারীর সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন না তোলাই ভালো। কারণ এগুলো বাঙালির কাছে স্পর্শকাতর বিষয়। তবে এখনো সংখ্যা নিয়ে যারা তথ্য পরিবেশন করেন এবং অনেক সময় মনগড়া বক্তব্য দেন, তাদের সতর্ক থাকা উচিত,” জানান লেখক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ, যিনি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন।


খালেদার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা চায় আ. লীগ

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত বলে মনে করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির দাবি, ”তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

বুধবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষে এ বক্তব্য তুলে ধরেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।

মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশে খালেদা জিয়ার  বক্তব্যের জবাব দিতে সংবাদ সম্মেলনের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ।

মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, এই কটাক্ষ করার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের রোষানল থেকে খালেদা ও তাঁর কর্মীরা যে অক্ষত আছেন; গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। নতুবা খালেদা ও তাঁর কর্মীরা রাস্তায় বের হতে পারত না। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে যেত।


খালেদা জিয়াকে উকিল নোটিশ

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে করা মন্তব্য প্রত্যাহার করতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন আহমদ  বুধবার এটি নোটিশটি পাঠান।

আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘তিনি স্বাধীনতা চাননি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন।’

খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। এ জন্য তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার জন্য সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছে। নইলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনে মামলা করা হবে।

রেজিস্ট্রি ডাকে বিএনপির নয়াপল্টনের কার্যালয় ও গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের ঠিকানায় এই উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন