মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য পদোন্নতিতে বৈষম্য সৃষ্টি না করার নির্দেশ ব্যাংলাদেশ ব্যাংকের

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.06.18
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-woman মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য পদোন্নতিতে বৈষম্য সৃষ্টি না করার নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক। জুন, ২০১৫
বেনার নিউজ

ব্যাংকের কোনো নারীকর্মী যে বছর মাতৃত্বকালীন ছুটি নেবেন, সেই বছরকে ভিত্তি করে তার কর্মমূল্যায়ন করা যাবে না। বরং মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগকালীন বছরের ঠিক আগের বছর বা আগের তিন বছরের গড় যেটি ভালো মনে হবে সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।

এ পদ্ধতির মূল্যায়নের ভিত্তিতে নারী কর্মীদের পদোন্নতির বিষয়টি দেখতে হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। যা একইদিন ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা নারীর মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিতে আরো সহায়ক করে তুলবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি বেসরকারী ব্যাংকের কর্মী নার্গিস আক্তার বলেন, “সমান পরিশ্রম করেও মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করার কারণে অনেক নারী কর্মীকেই পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। অথচ নারীর মা হওয়া একটি শাশ্বত বিষয়। এ কারণে তাকে পদোন্নতি না দেওয়ার অর্থ তার ‘মা হওয়া’কে অপমান করা। দীর্ঘদিন পরে হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নারীর সে মর্যাদা অনুধাবন করে নির্দেশনা দিয়েছে। যা মেয়েদের প্রতি মর্যাদাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বলা যায়। এছাড়া মা হওয়ার কারণে কাউকে আর পেশাগত অতৃপ্তিতে ভুগতে হবে না।”

প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ মহাব্যবস্থাপক রুপ রতন পাইন জানান, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার কারণে অনেক সময় ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মের প্রকৃত ও যথার্থ মূল্যায়ন করা হয় না;  যা নারীর উন্নয়ন, অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নের পথে অন্তরায়। এ প্রেক্ষিতে, ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগের বছরে তাদের বার্ষিক কর্ম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছর বা পূর্ববর্তী তিন বছরের গড় (যেটি উত্তম) বিবেচনায় নেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

সদ্য মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে আসা আরেকটি বেসরকারী ব্যাংকের কর্মী মাহমুদা ইয়াসমিন বেনারকে বলেন, “ব্যাংকে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটালে নিজের ব্যাচে সহকর্মীদের থেকে পদোন্নতিতে পিছিয়ে যাওয়াটাই নারী কর্মীদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন ক্ষেত্রে পদোন্নতির পরীক্ষায় পাস করলেও মূল্যায়নপত্রে পদোন্নতির সুপারিশ থাকত না। এটা একজন মায়ের মাতৃত্বকে আঘাত করার সামিল। সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হবে সকল নারীরা।”

ব্যাংকগুলোর পুরুষ কর্মীরাও সাধুবাদ জানিয়েছেন এ সিদ্ধান্তকে।

অগ্রনী ব্যাংক লিমিটেডের একজন সিনিয়র অফিসার বিলাস ভূষণ পাল বেনারকে বলেন, “একজন নারী কর্মী সারা বছর কাজে দক্ষতা দেখায়। কিন্তু ছুটি নেওয়ার কারণে তার বাৎসরিক মূল্যায়ণে ‘ডাউন’ দেখানো হয়। অথচ কর্মী হিসেবে তিনি ‘ডাউন’ পাওয়ার মত নন। শুধুমাত্র সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে একজন দক্ষ কর্মীর জন্য এমন অবমূল্যায়ন মেনে নেওয়ার মত নয়। তাই আমি অন্তত পুরুষদের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সাধুবাদ জানাই মাতৃত্বের মর্যাদা উপলব্ধি করার জন্য।”

এক্ষেত্রে পুরষ কর্মীদের বেশি কাজ করে পদোন্নতি পেতে হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একজন নারীর মা হওয়ার কষ্ট পৃথিবীর কোন কষ্টের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। তাই ছয় মাসে একজন পুরুষ কর্মী সেই মায়ের তুলনায় ব্যাংকে কতটুকু বেশি কষ্ট করছেন তা বিবেচনা না করাটাই শ্রেয় বলে আমি মনে করি।”

জানা যায়, শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটি নয়, যে কেউ দীর্ঘ দিনের ছুটি ভোগ করলে তাকেও এ ধরনের পদোন্নতি বঞ্চনায় ভুগতে হয়। তবে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে দীর্ঘ ছুটি কাটালে সেক্ষেত্রে কোন নিয়ম অনুসরণ করা হবে সে বিষয়টি উল্লেখ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে নারী কর্মীদের এই ‘মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য পদোন্নতি বঞ্চনা’  সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে সত্য নয় বলে দাবি করেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল কুদ্দুস।

কিছু কিছু ব্যাংকে নারী কর্মীরা এ ধরনের বঞ্চনার শিকার উল্লেখ করে তিনি বেনারকে বলেন, “ শুরু থেকেই এনআরবি ব্যাংক নারী কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তারা সকল সুবিধা ভোগ করেন। মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়েও তারা পূর্বের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। তাই আমাদের ক্ষেত্রে এ অভিযোগ আনা যাবে না। তবে কিছু কিছু ব্যাংকে এ অনিয়ম আছে বলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। নারীর মর্যাদা এবং কর্ম পরিবেশের স্বার্থে যা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।”

এর আগে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ৬  মাসের বিষয়টি মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বুধবারের প্রজ্ঞাপণে বাংলাদেশ ব্যাংক নারীর কাজের অবদানকে স্বীকার করে আরো জানায়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। সরকার নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ণে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে নারী শিক্ষাসহ নারী উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বিভিন্ন পেশায় নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে এবং ব্যাংকিং খাতেও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।