পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে পৈশাচিক কায়দায় শিশু হত্যা

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.07.25
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
20160725-Child-Labour1000.jpg এই বয়সে ওদের যাওয়ার কথা স্কুলে,কিন্তু জীবিকার তাগিদে তাদের যেতে হয় কাজে। মাওয়া ফেরিঘাট এলাকার শ্রমজীবী দুই শিশু বৃষ্টির পানি ঠেকাতে ছাতার বদলে কলাপাতা মাথায় দিয়ে পথ চলছে। জুলাই ২৫, ২০১৬।
ফোকাস বাংলা

বন্দরনগর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি সুতা তৈরির কারখানায় পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে সাগর বর্মণ (১০) নামের এক শিশুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

নিহত শিশুর বাবা রতন বর্মণ বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন, যিনি ওই কারখানার শ্রমিক ছিলেন। মামলায় আসামি হিসেবে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

র‍্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়, সাগর হত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জনকে আটক করা হয়েছে।

গত রোববার দুপুরে উপজেলার যাত্রামুড়া এলাকার এখলাছ স্পিনিং মিলে এ ঘটনা ঘটে। সাগর ও তাঁর বাবা ওই কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

গত বছরের ৩ আগস্ট খুলনায় মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ার কমপ্রেসর মেশিনের নল পায়ুপথে ঢুকিয়ে শিশুশ্রমিক রাকিবকে (১২) হত্যা করা হয়। এর প্রায় এক বছরের মাথায় একই ধরনের এমন একটি নৃশংস ঘটনা ঘটল।

 

নিহত শিশু সাগর বর্মণ(১০)।

খুলনার ওই নৃশংস ঘটনা স্তম্ভিত করে সারা দেশের মানুষকে। ওই ঘটনায় আদালত গত ৮ নভেম্বর দুই আসামি মো. শরীফ ও মিন্টু খানের ফাঁসির আদেশ দেন।

“প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, শিশু সাগরের পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বা কী কারণে ঘটিয়েছে, তা জানা ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে,” বেনারকে জানান নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মতিয়ার রহমান।

২৭ শিশু শ্রমিক উদ্ধার

পায়ুপথে বাতাস দিয়ে শিশু হত্যার ঘটনাস্থল জোবেদা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড থেকে ২৭ শিশু শ্রমিককে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১০ থেকে ১৩ বছর বয়সী ওই শিশুদের তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ জাকারিয়া বেনারকে জানান, একই কমপ্লেক্সে একই মালিকের তিনটি কারখানা—জোবেদা টেক্সটাইল মিলস, আজহারুল স্পিনিং মিলস ও এখলাছ স্পিনিং মিলস লিমিটেডে সাড়ে চার হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এঁদের মধ্যে ১ হাজার ২০০ শিশু শ্রমিক রয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তিনি বলেন, “এর মধ্যে জোবেদা টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে আমরা ২৭ জন শিশু শ্রমিককে উদ্ধার করেছি। শিশুদের তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

মামলা গ্রেপ্তার

নিহত শিশুর পিতা রতন বর্মন (৭০) বাদী হয়ে গত ২৪ জুলাই রাতে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নাজমুল হুদাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। বাকিরা পলাতক রয়েছে।

দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় (পরস্পরের যোগসাজশে হত্যার অপরাধ) দায়েরকৃত মামলায় আসামি করা হয়েছে কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নাজমুল হুদা (২৪), ব্যবস্থাপক (উৎপাদন) হারুনুর রশিদ (৪৮), জ্যেষ্ঠ উৎপাদন কর্মকর্তা আজহার ইমাম ওরফে সোহেল (৩৬), সহকারী উৎপাদন ব্যবস্থাপক রাশেদুল ইসলাম (৪০) সহ অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন লাইনম্যান ও সুপারভাইজারকে।

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইসমাইল হোসেন এজাহারে বাদীর অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে বলেন, জোবেদা টেক্সটাইলের মালিক মোজাম্মেল হক ভূঁইয়া, মাজহারুল হক ভূঁইয়া, আজহারুল হক ভূঁইয়া, জাফর হোসেন ভূঁইয়া শিশু শ্রমিকদের দিয়ে কম বেতনে কারখানায় উৎপাদন কাজ করাতেন।

গত ২৪ জুলাই দুপুরে ১২টায় শিফট শেষে সাগর শরীরে লেগে থাকা তুলা ও ধুলা পরিষ্কার করার জন্য কারখানার হাওয়া মেশিনের কাছে যায়। এর কিছুক্ষণ পর তাঁর বাবা জানতে পারেন ছেলে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে এবং পেট ফুলে উঠেছে, কথা বলতে পারছে না।

এজাহারে আরও বলা হয়, তখন কারখানার লোকজন সাগরকে রিকশায় তুলে তিন কিলোমিটার দূরে কাঁচপুরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে ফেরত দেয়। আবারও সাগরকে রিকশায় করে কারখানায় ফেরত নেওয়া হয়। কারখানা থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানকার কর্তব্যরত ডাক্তার শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

“আসামিরা কাজকর্মের সামান্য ত্রুটি পেলেই তাদের গালাগালি ও মারধর করতো। সাগর মাঝে মধ্যে অন্যায় নির্যাতনের প্রতিবাদ করতো। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আসামিরা ২৪ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিলের হাওয়া মেশিনের পাইপ সাগরের পায়ুপথে ঢুকিয়ে হত্যা করেছে,” এজাহারে উল্লেখ করেন সাগরের বাবা রতন বর্মন।

নিহত সাগর বর্মনের বড় ভাই রিপন বর্মনের স্ত্রী অঞ্জনা বর্মন মুঠোফোনে বেনারকে বলেন, “আমার দেবরকে গত দুই মাস আগে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা এর বিচার পাইনি। এখনকার এই ঘটনার বিচার চাই।”

এদিকে শিশু শ্রমিক সাগর বর্মনকে পায়ু পথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নাজমুল হুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

সোমবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আশিক ইমামের আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

“এসব হত্যাকাণ্ড সমাজের নৈতিক-ধস ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়ারই বহিঃপ্রকাশ। এ ছাড়া এ ধরনের ঘটনা সমাজে কতিপয় বিকারগ্রস্ত ব্যক্তির বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ,” বেনারকে জানান নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি।

তিনি বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষকে আজ কতটা হিংস্র করে তুলেছে এ সবই তার প্রমাণ।

“খুলনার রাকিব হত্যার বিচার তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করে সরকার একটি নজির স্থাপন করেছিল; আমরা চাই সাগর হত্যার বিচারও তেমনি দ্রুত সম্পন্ন করা হবে,” জানান রফিউর রাব্বি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।