ভারতের রাজধানীর কাছে দাঙ্গার পর সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার রেশ শেষ হয়ে যায় নি

রোহিত ওয়াধওয়ানি
2015.06.16
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
Ind-riot আতালিতে হিন্দু মন্দিরের কাছে মুসলিমরা মসজিদ নির্মাণ করতে গেলে দাঙ্গা বাঁধে। নিরাপত্তা বাহিনী নির্মাণাধীন মসজিদ ও এলাকা পাহারা দিচ্ছে। ১৫জুন,২০১৫
এএফপি

নয়াদিল্লি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে আতালি গ্রামে অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ৩ সপ্তাহ পর ৫০০ মুসলিম অধিবাসীকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হলে তারা রিফিউজি হিসেবে নিকটস্থ থানায় আশ্রয় নেয়।

জাত এবং মুসলিমরা বছরের পর বছর সেখানে একত্রে বসবাস করে আসছিলো। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয় একটি মন্দিরের কাছে মসজিত নির্মাণকে কেন্দ্র করে, গত ২৫ মে সংঘটিত হয় দাঙ্গা। এতে মুসলিমদের ১৫টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয় এবং এতে ৫ ব্যক্তি আহত হয়।

সালমা বেগম যার বাড়ি পোড়ানো হয়, বেনার নিউজকে বলেন, “বাড়ি হয়তো নতুন করে নির্মাণ করা যাবে, কিন্তু দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে তা আর জোড়া লাগানো যাবে না। এখনো অবস্থা খারাপ, তারা গ্রামের ধর্ম নিরপেক্ষ বন্ধনের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে”।
রায়ট মাত্র ২ ঘন্টা স্থায়ী হয়, এরমধ্যেই মুসলিম অধিবাসীরা পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

গত ২৫ মে থেকে হরিয়ানা রাজ্যের এই গ্রামে কারফিউ বলবত রয়েছে। আতালির বিভিন্ন প্রবেশ পথে ১,০০০ র‍্যাপিড একশন ফোর্সের সদস্য মোতায়েন রয়েছে, ২৪ ঘন্টা তারা স্থানীয় রাস্তা-ঘাট পাহারা দিচ্ছে। ৫ জনের বেশি লোক একখানে জড়ো হওয়ার ওপর নিষেদাজ্ঞা রয়েছে। দোকান-পাট ও বানিজ্য কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।

জাত ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা একে অপরের চোখে চোখেও তাকাতে পারছে না। সালমা বেগম জানান, “রায়টের আগে আমরা খোলামনে সবাই বাস করতাম, এখন আমরা কথা বলা এড়িয়ে চলি। একে অপরের রাস্তা পার হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কিভাবে কথা বলবেন, যেখানে ক’দিন আগেও আপনাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে”। তিনি প্রশ্ন রাখেন।

আতালিতে ১০ হাজারের মতো জাত সম্প্রদায়ের অধিবাসী বসবাস করছে পক্ষান্তরে সেখানে মাত্র ৫০০ মুসলিম বাস করে আসছিলো।

যদিও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যস্থতায় গত ৫ জুন থেকে মুসলিমরা তাদের ঘর-বাড়িতে ফিরে আসা শুরু করেছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। কিন্তু মুসলিমরা বলছেন, ‘আমরা একটা ভয়ের আবহের মধ্যে আছি’, কখন না আবার সহিংসতা শুরু হয়।

জামাল মেহদি,৩৭, বেনারকে জানান, “এই মুহূর্তে গ্রামে নিরাপত্তার অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, আমরা কিছুটা নিরাপদ বোধ করছি।কিন্তু এই অস্ত্রধারী পুলিশ তো চিরকাল থাকবেনা, কি হবে তখন, যখন তারা চলে যাবে?”

বালাভঘড় পুলিশ স্টেশনে সে, স্ত্রী ও তার ২ পুত্র সহ ১০ রাত একটি তাবুতে ঘুমিয়েছে। গত ৫ জুন মেহেদি ও তার স্ত্রী বাড়িতে ফিরে আসে। তবে, ১২ ও ১০ বছরের ২ ছেলেকে পাশের গ্রামের আত্নীয়র কাছে রেখে আসে।

মেহেদি জানায়, “ আমি ও আমার স্ত্রী ফিরে আসি কারণ এটা আমাদের বাড়ি। কিন্তু আমরা সন্তানদের নিয়ে আসিনি, যদি আবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাইরে যায়”। তারা ১৯৯৯ সাল থেকে আতালিতে  বসবাস করে আসছে। কিন্তু এখন অন্যত্র চলে যাবার কথা ভাবছে।

দাঙ্গার শিকার ২৮টি পরিবার রোববার সরকারের ক্ষতিপূরন বাবদ ১ লাখ করে রুপি(১,৫৬১ ডলার)গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানায়, প্রাথমিকভাবে সরকারের ঘোষণা ছিলো এর চেয়ে চার গুণ।

আতালির অধিবাসী নিজাম আলি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন , “ আমাদের বাড়ি ও জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং ২ সপ্তাহ বাড়িতে ফিরতে পারিনি। কৃষি কাজের ক্ষতি হয়েছে, ব্যবসা এখন শূন্য থেকে আবার শুরু করতে হবে”।

এদিকে, জাত সম্প্রদায় মসজিদ নির্মাণে বাধা দান অব্যাহত রাখবে বলে জানায়।

জাত সম্প্রদায়ের এক সদস্য সঞ্জয় যে তার পুরো নাম জানাতে অস্বীকার করে এবং বেনারকে জানায়, “আমরা মন্দিরের কাছে মসজিদ বানাতে দেবো না। যদি তারা আবার চেষ্টা করে আমরা কোনো কিছু নিশ্চয়তা দিতে পারবো না”। মসজিদটি এখনো নির্মাণাধীন রয়েছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, মাস দুই আগে হরিয়ানা রাজ্যের বড় শহর ফারিদাবাদ আদালতে উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে। আদালতে বলা হয়, হিন্দু আবেদনকারী বলতে ব্যর্থ হয়েছে যে মসজিদটি গ্রাম পঞ্চায়েতের মালিকানাধীন জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে।

জাত সম্প্রদায়ের আরেকজন গজরাজ পরিচয় দিয়ে বলেন , “আমরা তাদেরকে বলেছি, মসজিদ তারা নির্মাণ করতে পারে গ্রামের বাইরে। আমরা তাদেরকে নির্মাণের খরচও দিতে চেয়েছি। কিন্তু অবশ্যই এখানে না, যেখানে তারা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে”।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ২৫ মে’র ঘটনায় তারা ৬৫ জনকে চিহ্নিত করে অভিযোগ দায়ের করেছে, তবে পুলিশ কাউকে এখনো গ্রেফতার করেনি। পুলিশের সহকারী কমিশনার ভিষ্ণু দয়াল জানান, সন্দেহভাজন অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে, “পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আছে”, দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করে আপসের ব্যবস্থাও সফল হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন। "আমরা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। গ্রেফতার করা হলে আবার উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে, সেট এড়ানোর চেষ্টা করছি", জানালেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।