‘আইএস’ বাংলাদেশের আমির তামিম চৌধুরি শনাক্ত,পুলিশের মামলা

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.07.28
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
160728-BD-jmb-620.jpg কল্যাণপুরের তাজ মঞ্জিলে অভিযানের পর জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধারকৃত অস্র ও জঙ্গিদের ব্যবহৃত সামগ্রি, জুলাই ২৬, ২০১৬।
এএফপি

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরীকে আসামি করে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রসারের অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী। তবে এই প্রথম তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলা হলো।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “তামিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো মামলা দায়ের হলো। এই তামিমকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজছে।”

কল্যাণপুরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নয় জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় গতকাল বৃহস্পতিবার ওই মামলা হয়। মামলায় নাম উল্লেখ করে তামিমসহ ১০ জন এবং অজ্ঞাতনামা অনেককে আসামি করা হয়েছে।

গত ১৩ এপ্রিল ইসলামিক স্টেট—আইএসের মুখপাত্র দাবিকে শাইখ আবু ইব্রাহীম আল হানিফ নামের এক ব্যক্তি নিজেকে বাংলাদেশের আমির বলে দাবি করেন। দাবিকে প্রকাশিত ওই ছবি দেখে তামিম চৌধুরীকে শনাক্ত করা হয়।

 

পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আসামি কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরি। ফাইল ফটোঃ বেনার নিউজ।

 

তামিমের পৈত্রিক বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার। তবে ১৯৮৬ সালে তামিম কানাডায় জন্ম নেন এবং কখনই পৈত্রিক ভিটায় আসেননি।

বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুবের আহমদ বেনারকে বলেন, “কানাডা থেকে নিখোঁজ হওয়ার কারণে তার সম্পর্কে আমরা খুব বেশি জানতে পারিনি। আমরা তার পৈতৃক বাড়ি বিয়ানীবাজারে গিয়ে তার সম্পর্কে খোঁজখবর করার চেষ্টা করেছিলাম। জন্মের পর তিনি কখনোই বিয়ানীবাজারে আসেননি বলে তার আত্মীয়স্বজনেরা বলেছেন।”

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর থেকে গণমাধ্যমে তামিম চৌধুরীর ছবি ও পাসপোর্ট নম্বর প্রচার করা হচ্ছে। র‍্যাব যে ৬৮ জন নিখোঁজের তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানেও নাম রয়েছে তার।

মিরপুর থানায় মামলা দায়ের

কল্যাণপুরের তাজ মঞ্জিলে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নয় জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় দশ আসামির নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা অনেককে দায়ী করে মামলা করেন মিরপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. শাহজালাল আলম।

গত মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৫১ মিনিটে সোয়াতের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। এক ঘণ্টার ওই অভিযানে নয় জঙ্গি ঘটনাস্থলে নিহত হয়।

তামিম চৌধুরী ছাড়া ওই মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন; মো. রকিবুল হাসান ওরফে রিগান (২১), পলাতক আসামি ইকবাল, তামিম চৌধুরী, রিপণ, খালেদ, মামুন, মানিক, জোনায়েদ খান, বাদল, আজাদুল ওরফে কবিরাজ ও অজ্ঞাতনামা অনেকে।

ডিএমপির মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বেনারকে বলেন, “ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার রকিবুল হাসান রিগানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করেছে। তার ভিত্তিতেই মামলা দায়ের করা হয়।”

মামলার এজাহারে যা আছে

এজাহারে বলা হয়েছে, জঙ্গিরা বাংলাদেশের জননিরাপত্তা, সংহতি ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন ও বহিঃবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। তারা আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশকে আহত করাসহ বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী।

রিগানকে উদ্ধৃত করে পুলিশ বলেছে, আসামি ও অজ্ঞাতনামা অনেকে তাদের কল্যাণপুরের ফ্ল্যাটে আসত। তাদের ধর্মীয় ও জিহাদি কথাবার্তায় উদ্বুদ্ধ করত এবং প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা দিয়ে যেত।

রিগান আরও জানায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি নামক জঙ্গি সংগঠন ও সমর্থনপুষ্ট অন্যান্য সংগঠনের নেতা, কর্মী ও সমর্থকেরা তাদের এ কাজে অর্থ, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছে।

পুলিশের জব্দ তালিকায় মেড ইন চায়না, মেড ইন ইউএসএ ও মেড ইন জাপান লেখা মোট চারটি পিস্তল, ছুরি, বটি, দাসহ ৫৪ ধরনের উপকরণের উল্লেখ আছে।

“নিহতদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনেম খানের নাতি ‘আকিফুজ্জামান’ রয়েছে, এ ছাড়া সবাই নব্য জেএমবি,” জানান মনিরুল।

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল বলেন, নিহতদের মধ্যে ঢাকার তিনজনই ছিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

সম্মেলনে বলা হয়, নিহত জঙ্গিরা সবাই চার মাস থেকে দুই বছর আগে বাড়ি ছাড়ে।জঙ্গিদের ভাষায় ‘হিজরত’ করেন। তিনি বলেন, অভিযানের সময় তারা তাদের ব্যবহার করা দুটি ল্যাপটপ ভেঙে ফেলেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি ও নগদ টাকা পুড়িয়ে ফেলেছে।

“তারপরও সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদে আহত জঙ্গি রিগানের কাছ থেকে ও বিভিন্ন সূত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে,” জানান মনিরুল।

রিগানের বরাতে মনিরুল জানান, কল্যাণপুরের বাসা থেকে পলাতক আরেক জঙ্গির নাম ইকবাল। তাকেও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।

গুলশানে হামলাকারীদের সঙ্গে যোগসূত্র

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার গুলশানে নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে কল্যাণপুরে নিহত জঙ্গিদের কারও কারও যোগোযোগ ছিল বলে জানান। গতকাল তিনি নিহত আরেক জঙ্গির পরিচয় প্রকাশ করেন। তার নাম রায়হান কবির।

মনিরুল ইসলাম বলেন, গুলশানে নিহত জঙ্গি নিবরাজ কল্যাণপুরে নিহত শেহজাদ রউফ ওরফে অর্কের বন্ধু। এ ছাড়া কল্যাণপুরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত জঙ্গি রায়হান কবির প্রসঙ্গে জানান, পুলিশের খাতায় তার নাম ছিল তারেক। অনেকদিন ধরে পুলিশ তারেককে খুঁজছে।

রায়হান সম্পর্কে সিটি টিমের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, “গুলশান হামলার তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পেরেছি, সাত জঙ্গিকে গাইবান্ধা সাদুল্যাপুরের একটি চরে দুজন প্রশিক্ষণ দেন। এই দুই প্রশিক্ষকের একজন রায়হান। বন্দুকযুদ্ধে জেএমবির ঢাকা অঞ্চলের কামান্ডারের মৃত্যুর পর রায়হান এই অঞ্চলে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করত। তার সঙ্গে গুলশান হামলায় নিহত জঙ্গিদের পরিচয় ছিল।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।