প্রাণ ভিক্ষার আবেদনে মীর কাসেমের শর্ত

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.08.31
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
20160831-Meer-Kasem-Wife1000.jpg কারাগারে স্বামীর সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মীর কাসেম আলীর স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুন। আগস্ট ৩১, ২০১৬।
নিউজরুম ফটো

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার প্রসঙ্গে শর্ত জুড়ে দিয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী। স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুনের মাধ্যমে তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নিখোঁজ ছেলেকে ফিরে পেলে তার সঙ্গে পরামর্শ করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

একাত্তরে নির্মমতার জন্য চট্টগ্রামে ‘বাঙালি খান’ নামে পরিচিত কাসেম তার স্ত্রীকে বলেছেন, প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে তিনি ছেলের সঙ্গেই পরামর্শ করতে চান। গত ৬ আগস্ট তার ছেলে  ব্যারিস্টার আহম্মেদ বিন কাসেমকে বাসা থেকে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেছে, যিনি তার বাবা মীর কাসেমের একজন আইনজীবী ছিলেন।

“এই কঠিন সময়ে পারিবারিক পরামর্শের জন্য তাকে প্রয়োজন,” সাংবাদিকদের জানান মীর কাসেমের স্ত্রী আয়েশা।

গতকাল বুধবার বিকেল পৌণে চারটার দিকে জেলাখানায় সাক্ষাৎ শেষে বের হয়ে আয়েশা আরও বলেন, ছেলেকে ছাড়া রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেবেন না তাঁর স্বামী। পরিবারও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না।

মীর কাসেম আলীর সঙ্গে দেখা করতে বেলা পৌনে তিনটার দিকে কারাগারে যান স্ত্রীসহ তার পরিবারের নয় সদস্য।

“পরিবারের সদস্যরা নিজেরা উদ্যোগি হয়ে মীর কাসেমের সঙ্গে দেখা করতে কাশিমপুর কারাগারে গিয়েছিলেন। কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষ তাঁদের ডাকেনি,” বেনারকে জানান কাশিমপুর কারাগারের (পার্ট-২) কারাধ্যক্ষ নাশির আহমেদ।

১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে মীর কাসেমের ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গত মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ আদালত খারিজ করে দেন। এর পরপরই ৬৩ বছর বয়সী মীর কাসেমের ফাঁসি কার্যকরের সব ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তবে তার ফাঁসি কাশিমপুর, না কেরানীগঞ্জ নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর হবে, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক লে. কর্নেল ইকবাল হাসান।

ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে শেষধাপ হচ্ছে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করা। প্রাণভিক্ষা না চাইলে বা প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হলে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আর কোনো বাধা থাকবে না। কিন্তু এই আবেদন করা বা না করার সঙ্গে সন্তানকে ছেড়ে দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন মীর কাসেম।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার আহম্মেদ বিন কাসেমের বিষয়ে কোনও বক্তব্য দেওয়া হয়নি। সে কোথায় আছে, তাও স্পষ্ট নয়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একটি সূত্র বেনারকে জানিয়েছে, ফাঁসি এড়ানোর জন্য এটা মীর কাসেমের একটি কৌশল।

মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকরের আশা প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।

“এ রায় জাতির প্রত্যাশিত রায়। এ রায়ে জাতি সন্তুষ্ট। আমরা আশা করি যে, এ রায় দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতি কলঙ্কমুক্ত হওয়ার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। কোনো কৌশল করে এই রায়ের বাস্তবায়ন ঠেকানো যাবে না,” বেনারকে জানান হানিফ।

এদিকে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন বলেছেন, মীর কাসেম আলী তার প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে যৌক্তিক সময় (রিজনেবল সময়) পাবেন। ঢাকার বকশীবাজারের কারা অধিদপ্তরে বুধবার এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকেরা এই ‘রিজনেবল সময়ের’ ব্যাখ্যা জানতে চাইলে মহাপরিদর্শক বলেন, কাসেম কতদিন সময় পাবেন, ‘পরিস্থিতিই তা বলে দেবে’।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারাবিধি অনুযায়ী প্রাণভিক্ষার জন্য আসামিরা সাত দিন সময় পেলেও যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে ওই নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

“একাত্তরে মীর কাসেম তো কাউকে সময় বা ছাড় দেননি। যাদের তিনি খুন করেন, তাঁদেরও বাবা অথবা ছেলে ছিল। একাত্তরের শহীদেরা কী তাঁদের বাবা বা সন্তানদের মত নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল?” বেনারের কাছে প্রশ্ন রাখেন কারওয়ানবাজারের মুদি দোকানদার আবুল কালাম আজাদ। তিনি মনে করেন, এসব অজুহাতে কালক্ষেপন না করে এখনই তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো দরকার।

এর আগে যুদ্ধাপরাধী মো. কামারুজ্জামান এবং পরে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও বলেছিলেন, প্রাণভিক্ষার সুযোগ নেবেন কি না-তা জানাতে আসামি ‘যৌক্তিক সময়’ পাবেন।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছিলেন, একটি ‘মার্সি পিটিশন’ লিখতে যে সময় লাগে এক্ষেত্রে সেটাই ‘যৌক্তিক সময়’ বলে তিনি মনে করেন।

আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মঙ্গলবার রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন, প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য সাত দিন অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত সময়।

প্রসঙ্গত,২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু হয়। এরইমধ্যে মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আজম, আল-বদর নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মীর কাসেম আলীর মতো শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

এরই মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হয়েছে নিজামী, মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। এখন ফাঁসির অপেক্ষায় আছেন মীর কাসেম আলী, যিনি একাত্তরে চট্টগ্রামে আল-বদর বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জামায়াতের অর্থদাতা হিসেবে তিনি পরিচিত। আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত গোলাম আজম কারাগারেই মারা গেছেন। একই সাজায় সাঈদী এখন কারাগারে আছেন।

জামায়াতের ডাকে ঢিলেঢালা হরতালের সময়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি ঝটিকা মিছিল ছবি: নিউজরুম ফটো

ঢিলেঢালা হরতাল পালিত

বুধবার জামায়াতের ডাকা হরতাল সেই অর্থে পালিত হয়নি। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল।

মীর কাসেমের রিভিউ আবেদন খারিজের প্রতিবাদে তার দল জামায়াতে ইসলামী সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা এই হরতাল ডেকেছিল, যাদিও তাতে জনজীবনে প্রভাব পড়েনি। দলটি তাদের প্রত্যেক নেতার ফাঁসির রায় ঘোষণা ও ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর গতানুগতিক হরতাল ডেকে আসছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।