যানজটমুক্ত ঢাকা গড়ার প্রত্যয়ে শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.06.27
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
Metro-rail620.jpg প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মেট্রোরেলের ডিজিটাল উদ্বোধন করেন। জুন ২৬, ২০১৬।
ইয়াসিন কবির

রাজধানী ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল। মাত্র ২০ কিলোমিটার পথ, কিন্তু যেতে সময় লাগে কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা। যানজটের কারণে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি রুটেই এভাবে নষ্ট হচ্ছে রাজধানীবাসীর মূল্যবান সময়।

তবে যানজটমুক্ত রাজধানী করতে ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে শুরু হয়েছে কাঙ্ক্ষিত মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। মাত্র ৩৮ মিনিটে যাত্রীদের উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছে দেবে এই তড়িৎ যান।

একইসঙ্গে গাজীপুর থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) বা বাসের জন্য বিশেষ লেন নির্মাণ কাজও শুরু হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একটি কোম্পানি ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। আর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও সেতু বিভাগ যৌথভাবে নির্মাণ করছে বিআরটি।

গত রোববার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এসব কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আধুনিক এসব যোগাযোগ ব্যবস্থা যানজটের শহর ঢাকায় ব্যাপক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছে সরকার। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বড় এই প্রকল্প যানজট নিরসনে কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।

দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে নগরবাসীর। ফ্লাইওভার নির্মাণসহ নানামুখী উদ্যোগ নিয়েও যানজট নিরসনে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে মেট্রোরেল নির্মাণ ছিল সময়ের দাবি।

আর সে দাবি পূরণ হতে চলেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমাদের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে।”

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত ও সহজ করার লক্ষ্যে প্রকল্প নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ঢাকায় অতিরিক্ত মানুষের বসবাস। যে পরিমাণ রাস্তাঘাট থাকার কথা, তা নেই। অন্যদিকে আর্থ-সামাজিক উন্নতি হওয়ায় মানুষের গাড়ি কেনার ক্ষমতা বাড়ছে। এমন অবস্থায় আমরা মনে করি উন্নয়ন টেকসই হওয়া প্রয়োজন।”

রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার এলিভেটেড মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

২০১৯ সালে প্রকল্পটি আগারগাঁও পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, ওই সময়ে উত্তরার তৃতীয় পর্ব থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেল চলবে। ২০২০ সালে সেখান থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল যাবে।

প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা মেট্রোরেলের এই লাইনে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্টেশন থাকবে বলে জানান তিনি।

এই স্টেশনগুলো থাকবে উত্তরা নর্থ, সেন্ট্রাল ও সাউথ, পল্লবী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও হোটেল, জাতীয় জাদুঘর, দোয়েল চত্বর, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম ও মতিঝিলের বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এমআরটি-৬ নামক এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থের ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিচ্ছে জাইকা। অবশিষ্ট অর্থ জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

এদিকে রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিম অংশের সংযোগসহ একটি সমন্বিত গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান হালনাগাদ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

শেখ হাসিনা জানান, এ পরিকল্পনা অনুযায়ী এয়ারপোর্ট থেকে খিলক্ষেত-বারিধারা-বাড্ডা-রামপুরা-মৌচাক হয়ে কমলাপুর এবং খিলক্ষেত-পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১; যার দৈর্ঘ্য ২৮ কিলোমিটার এবং গাবতলী-টেকনিক্যাল-মিরপুর-১, ১০ ও ১৪ থেকে বনানী-গুলশান-২ হয়ে ভাটারা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার এমআরটি লাইন-৫-এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

এ ছাড়া গাজীপুরসহ আশপাশের জেলার সঙ্গে রাজধানীর যাতায়াত সহজ করতে গাজীপুর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি লাইন স্থাপনের উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

আশাবাদী নন নগরবিদরা

এদিকে মেট্রোরেলকে নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন নগরবিদরা। এ বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বেনারকে বলেন, “কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা বা স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান-এসটিপি ২০১৩ এর তথ্য মতে, ঢাকায় প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি ট্রিপ হয়। যার ৭০ ভাগ হয় এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে। খুব সহজেই এই দূরত্ব হেঁটে যাওয়া যায়। ঢাকা পদচারী বান্ধব না হওয়ায় মানুষ হাঁটতে পারছে না। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ট্রিপ হয় বাসে। আর মাত্র সাত ভাগ ট্রিপ হয় প্রাইভেট কারে।”

ইকবাল হাবিব বলেন, “ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেলের মতো প্রকল্প সাধারণত অগ্রাধিকারের তালিকায় পাঁচ বা ছয় নম্বরে আসে। আমাদের যতগুলো মেট্রোরেলের প্রকল্প আছে তার সব বাস্তবায়ন হলেও মোট ট্রিপের মাত্র ১০ ভাগ কভার করতে পারবে। সুতরাং যানজট নিরসনে তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারবে না।”

তিনি আরও বলেন, “কোনো দেশের পরিবহন নিয়ে পরিকল্পনার আগে আর্থসামাজিক অবস্থা ও জনঘনত্ব বিবেচনায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেল ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। এর ১০ ভাগের এক ভাগ খরচে  বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি করা যায়, ৫০ ভাগের এক ভাগ খরচে হাঁটার পথ তৈরি করা হয়, ছয় ভাগের এক ভাগ খরচে কমিউটার রেল করা যায়।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।