মালয়েশিয়ায় নতুন সরকার: কমতে পারে বাংলাদেশিদের অভিবাসন ব্যয়

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-05-10
Share
নির্বাচনে জয়লাভের পর কুয়ালালামপুরে সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন মালয়েশিয়ার সাবেক ও নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ নির্বাচনে জয়লাভের পর কুয়ালালামপুরে সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন মালয়েশিয়ার সাবেক ও নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। ৯ মে ২০১৮।
AFP

মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে নজিব সরকারের পতন বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে।

অভিবাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, নজিব সরকারের আমলে গড়ে ওঠা দুই মালয়েশীয় কোম্পানি ও বাংলাদেশের সাত জনশক্তি রপ্তানিকারক কোম্পানি সর্বোচ্চ অভিবাসন খরচ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার পরিবর্তে কমপক্ষে সাড়ে তিন লাখ টাকা আদায় করত কর্মীদের কাছ থেকে।

বুধবার মালয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনে ৯২ বছর বয়সী মাহাথির মোহাম্মদের বিজয় বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বের জন্য একটি শিক্ষা বলে মনে করেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের মতে, এই নির্বাচন দেখিয়েছে যে জনগণের সমর্থন পেতে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন শাখার প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, মালয়েশিয়ায় নজিব সরকারের বিদায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দশ কোম্পানি। এ সকল কোম্পানির মালিকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল নজিব সরকার ও তাঁর উপ-প্রধানমন্ত্রীর।

হাসান বলেন, ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারিভাবে জনশক্তি রপ্তানিতে সম্মত হয়।

অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৩৭ হাজার টাকা। তবে, সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

২০১৫ সালে সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার কেলেঙ্কারি উন্মোচন হলে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মী প্রেরণের ব্যাপারে একমত হয়। অভিবাসন ব্যয় পুণঃনির্ধারণ করা হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকা।

শরিফুল হাসান বলেন, তবে কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই বাড়তি টাকার কারণ ওই কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেট। তারা বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিত।

অভিবাসন কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ নিয়ে করা বেসরকারি সংস্থা ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের প্রধান সাইফুল হক বেনারকে বলেন নজিব সরকারের বিদায় বাংলাদেশের জন্য ‘আশীর্বাদ’।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার দুই কোম্পানি সেদেশে ভিসার বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাঁর মতে, ওই দুই কোম্পানির মালিক প্রধানমন্ত্রী নজিব ও তাঁর মন্ত্রীদের খুব ঘনিষ্ঠ।

হক বলেন, ওই দুই মালয়েশীয় কোম্পানি ও বাংলাদেশের সাত জনশক্তি রপ্তানিকারক কোম্পানি একটি শক্ত সিন্ডিকেট তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, “দুই সরকারের চুক্তি অনুযায়ী প্রতি কর্মী ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু আদায় করা হচ্ছে কমপক্ষে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। এই বাড়তি টাকা দুই দেশের এই সিন্ডিকেটের কাছে যাচ্ছে।”

সাইফুল হক বলেন, মাহাথির সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ায় নজিবের কাছের লোকদের গড়া ওই সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে। আমাদের কর্মীদের অল্প টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, এখন সরকারের উচিত মালয়েশিয়ার নতুন সরকারের কাছে কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরা। এতে উপকৃত হবে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ।

১৯৭৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে নয় লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন তাঁদের অধিকাংশই দেশে ফিরে এসেছেন।

সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালে প্রায় এক লাখ কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন।

সম্পর্ক পরিবর্তন হবে না

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও বহিঃপ্রচার অণুবিভাগের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের সম্পর্ক মালয়েশিয়া ও সেদেশের জনগণের সাথে। কোন সরকার আসল আর কোন সরকার চলে গেল সেটি আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়।

নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। তাই আমরা মালয়েশিয়ার যেকোনো সরকারের সাথে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হবে না বলে জানান মহাপরিচালক দেলোয়ার হোসেন।

রাজনৈতিক শিক্ষা

প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বেনারকে বলেন, ৯২ বছর বয়সে ড. মাহাথির মোহাম্মদের ক্ষমতাসীন হওয়া বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের জন্য একটি শিক্ষা। তাঁকে নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, তিনি কেন নির্বাচনে জয়ী হলেন? তার কারণ হলো, তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। তার শাসনামলে দুর্নীতি ছিল না বললেই চলে। সেকারণেই জনগণ তাঁকে আবার ক্ষমতায় বসিয়েছে।

“আমাদের সরকারকে এই শিক্ষা নিতে হবে,” বলেন বিএনপির এই নেতা।

মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাবস্থায় মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর ডেপুটি আনোয়ার ইব্রাহিমকে সাজা দিয়েছিলেন। এবার নির্বাচনের আগে তিনি সেই আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে হাত মিলিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নজিব সরকারের পতন করেছেন ব্যালটের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, এই নির্বাচনের আরেকটি শিক্ষা হলো: দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রয়োজনে শত্রুকেও কাছে টেনে নিতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন