পাকিস্তান বাংলাদেশের অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী:সুজা আলম

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.07.19
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
PK-High-Commissioner1000.jpg প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম। জুলাই ১৯, ২০১৬।
ইয়াসিন কবির

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার ঘটনাগুলোতে মদদদাতা হিসেবে বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে পাকিস্তানের নাম। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও এ ঘটনায় পাকিস্তানের হাত থাকার অভিযোগ তুলেছেন।

তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যেকোনো ধরনের ‘ষড়যন্ত্রে’ জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলম।

গত সোমবার বেনারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ প্রত্যাখানের পাশাপাশি পাকিস্তানকে বাংলাদেশের অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী বলে দাবি করেন তিনি। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করে সুজা আলম সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তানের ‘দৃঢ়তার’ কথাও জানিয়েছেন।

ইন্টারভিউঃ

বেনার নিউজ: কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনাবিদ্যমান রয়েছে। এমন অবস্থায় দুদেশের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ককে কীভাবে দেখছেন?

সুজা আলম: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে আমি খুবই আশাবাদী। এর অন্যতম কারণ, দৃঢ় সম্পর্কের মূল ভিত্তি হল মানুষ। এই মানুষে মানুষে মজবুত বন্ধন রয়েছে। এ বন্ধনই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সময়ের সঙ্গে এ সম্পর্ক মজবুত হতে বাধ্য।

হ্যাঁ, বিভিন্ন বিষয়ে দুদেশের ভিন্নমত রয়েছে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও এমন ভিন্নমত থাকে। তবে সেটা পুরো সম্পর্কের ওপর প্রভাবে ফেলে বলে আমি মনে করি না। আশা করি, এই ভিন্নমত দু’দেশ কাটিয়ে উঠবে। আরো মজবুত সম্পর্ক তৈরির পথও বের হবে।

বেনার নিউজ: দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ণ কি?

সুজা আলম: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। পাকিস্তান মূলতঃ তৈরি পোশাক শিল্পে কাঁচামাল রপ্তানি করে। তবে এখন পাকিস্তানের জনগণ ও ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ভিসা পেতে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বিষয়ে আমি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। আশা করি, এ সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে।

কয়েকবছর আগেও পাকিস্তান বাংলাদেশে সেরা বিনিয়োগকারী তিনটি দেশের মধ্যে ছিল। এখনো অনেক পাকিস্তানি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছেন।

চামড়া শিল্পে পাকিস্তানের সুখ্যাতি রয়েছে। এ শিল্পে দক্ষও লোক আছে। বাংলাদেশও চামড়া পণ্য রপ্তানিতে এগিয়ে। তবে পাকিস্তান বাংলাদেশের মত চামড়াজাত পণ্য তৈরি করেনা। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানি রপ্তানিকারকদের বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। তবে তারাও ভিসা সমস্যায় পড়ছে।

আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, যখন থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তখন থেকেই বাংলাদেশিদের অবাধ যাতায়াত, বাণিজ্য সুবিধাকে আমি গুরুত্ব দিয়েছি। যা এখনো চলমান।

বেনার নিউজ: বর্তমানে বাংলাদেশে পাকিস্তানের বিনিয়োগ কত?

সুজা আলম: এই মুহুর্তে নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে এটা ১৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি হবে।

বেনার নিউজ: বাংলাদেশে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনে আইএসের অস্তিত্ব রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ দাবি করেছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

সুজা আলম: বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে কি নেই সে বিষয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতে তরুণ সমাজ অনুপ্রাণিত হচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিভিন্ন জিহাদী ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও তরুণরা মৌলবাদের দিকে ঝুঁকছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ যেকোনো দেশের মূল কাজ হবে এদের ভিত্তি খুঁজে তাদেরকে দমন করা।

বেনার নিউজ: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার পিছনে মদদদাতা হিসেবে পাকিস্তানের নাম এসেছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

সুজা আলম: এ (এশিয়া) অঞ্চল ও সন্ত্রাসবাদের গতিপ্রকৃতি নিয়ে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে, তারা জানেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করে যাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদকে ধ্বংস করতে যুদ্ধ করে যাচ্ছি আমরা। এ যুদ্ধে ইতিমধ্যে ১৬ হাজারের মত নাগরিককে হারিয়েছে পাকিস্তান।

পাকিস্তান ও পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ মঙ্গল কামনা করে। এ ধরনের ঘটনার (জঙ্গি হামলা) সঙ্গে পাকিস্তানের জড়িত থাকার বিষয়টি ‘কল্পনাতীত’। এ ধরনের অভিযোগ বোধগম্য নয়। আমি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি।

বেনার নিউজ: বাংলাদেশের উন্নয়নকে কীভাবে দেখছেন?

সুজা আলম: গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের ৬.২ শতাংশ উন্নয়ন হয়েছে, যা সত্যি আকর্ষনীয়। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সামাজিক সূচকগুলোকে সবার উপরে বাংলাদেশের অবস্থান। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য, নারীর কর্মসংস্থান—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি সত্যি চমৎকার।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে টেকনিক্যালি নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে। এ উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করবে।

উন্নয়নের ক্ষেত্রে চমৎকার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। এদেশে গ্রামীন ব্যাংক, ব্রাকের মত বিশ্ব মানের উদ্ভাবনী ভাবনা রয়েছে যারা দারিদ্রতা দূরীকরণে কাজ করছে।

বেনার নিউজ: আপনার দৃষ্টিতে এ দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধাগুলো কি?

সুজা আলম: বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সকল দেশের উন্নয়নের জন্য জন্যই উন্নত অবকাঠামো, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যা উন্নয়ন সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে এসবের মধ্যে নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বেনার নিউজ: সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ণ কি?

সুজা আলম: গুলশান হামলার মতো সন্ত্রাসী হামলা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়, প্যারিসসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশও আক্রান্ত হচ্ছে। তবে আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ তার আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সহযোগিতায় আসল অপরাধীদের খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে। আর একবার যদি অপরাধীরা ধরা পড়ে এবং কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হয়, তাহলে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, সাধারণ মানুষও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে।

 

বেনার নিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

সুজা আলম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।