বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে খুন হচ্ছে প্রগতিশীল মানুষ

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.04.25
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
Prof-Siddique-Killing620.jpg রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। এপ্রিল ২৫, ২০১৬।
ফোকাস বাংলা

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অস্থির ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে বাংলাদেশে একের পর এক প্রগতিশীল মানুষ খুন হচ্ছে বলে মনে করছে বিশ্লেষকেরা। ক্রমাগত ঘটে যাওয়া এসব হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে বলেও মনে করেন তারা।

গত শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়ার শালবাগান এলাকায় বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রশাসন এখন পর্যন্ত এর কোনো কূলকিনারা করতে না পারলেও সাম্প্রতিক অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের মতোই এ হত্যাকাণ্ডেরও দায় স্বীকার করেছে মধ্য প্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আই এস।

আঘাতের ধরন বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ধরনের সাথে অধ্যাপক রেজাউল হত্যার মিল রয়েছে। পুলিশের এমন বক্তব্যের পরপরই আইএস’র পক্ষ থেকে এ হত্যার দায় স্বীকার করা হয়।

তবে ইসলামি উগ্রপন্থীদের এসব দায় স্বীকারকে উড়িয়ে দিচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মতে, এসব দেশীয় জঙ্গি গোষ্ঠীরই কাজ।

এর আগে একই কায়দায় দেশে বেশ কয়েকজন মুক্তমনা ব্লগারকে খুন করা হয়। এসব ঘটনার কোনোটারই এখন পর্যন্ত কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বেলায় নাস্তিকতা, স্বাধীন মত দেওয়া বা ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলার কথিত অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু অধ্যাপক রেজাউলের বিরুদ্ধে এমন কোনো ​অভিযোগ নেই।

“আমার ওই শিক্ষক ছিলেন সংস্কৃতিমনা। ধর্মের বিপক্ষে কখনও কোনোদিন কথা বলেননি। জোর গলায় কথা শুনিনি। তাঁর ভদ্রতা ও সততা আমাদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর মতো মানুষ এভাবে নিহত হওয়া শুধু দুঃখজনক নয়, জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক,” বেনারকে জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সাবেক ছাত্র এবং সাংবাদিক মোস্তাফিুজর রহমান।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, একের পর এক ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোর কোনটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য তারা দেশের বিচারহীনতাকে দায়ী করছেন। এসব হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে সরকার বা প্রশাসনের বক্তব্যকেও স্ববিরোধী বলেও মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নুর খান বেনারকে বলেন, “এসব হত্যাকাণ্ড বা হামলা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়ানো ধর্মীয় সশস্ত্র গ্রুপের কাজ।”

বাংলাদেশে ‘আইএস’র অবস্থান প্রশ্নে সরকারের বক্তব্য ‘বিপরীতমুখী’  উল্লেখ করে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, “বাংলাদেশে আইএস নেই বলে সরকার যেমন বক্তব্য দিচ্ছে, তেমনি আইএস-সন্দেহে আটকও করা হচ্ছে। সুতরাং বিপরীতমুখী অবস্থান লক্ষ্য করছি।”

“তবে বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে এ ধরনের সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে। এখন একের পর এক ব্লগার, মুক্তমনা মানুষ হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে বাংলাদেশে ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব রয়েছে। আমাদের প্রশাসনিক দক্ষতার অভাবে ও বিচারহীনতা এবং ভয়ের সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে,” জানান নুর খান।

দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিয়া আহমেদ বন্যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনার পর তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, “বিচারহীনতাকে যখন একটা সমাজের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা হয়, তখন কিন্তু সেটা থেকে কেউই বাদ যায় না।”

“তথাকথিত 'নাস্তিক ব্লগার’ দিয়ে যে কোম্পানির শুরু, তারই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিমনা শিক্ষক, যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়া অ্যাকটিভিস্ট, শিয়া সম্প্রদায়, হিন্দু পুরোহিত, সাধু, আদিবাসী, তনুরাসহ কেউই বাদ যাচ্ছেন না। যারা আজ ‘আমি না’ ভেবে শান্তির ঢেকুর তুলে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে যাচ্ছেন, তাদের দুয়ারেও চাপাতি পৌঁছে যেতে পারে যে কোন মুহূর্তেই।”

“উটপাখির মতো বালুতে মুখ গুঁজে রাখলেই যদি প্রলয় বন্ধ করা যেত তাহলে মানব সমাজের ইতিহাস আজকে হয়তো অন্যভাবে লেখা হত,” লিখেছেন বন্যা।

আন্দোলন অব্যাহত, নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড়

অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যাকাণ্ডের পরপরই দেশে–বিদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারও দাবি করা হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ সারা দেশে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। দোষীদের গ্রেপ্তারে সাত দিনের সময় বেঁধে দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স।

পৃথক বিবৃতিতে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়া দুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট খুনিদের বিচারের আওতায় আনারও আহ্বান জানান। শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে সমাজের বড় ক্ষতি হয়—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বস্তির বিষয় হচ্ছে এই বীভৎস হামলার বিরুদ্ধে ছাত্ররা দ্রুত মাঠে নেমেছে।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, “তিনি (রেজাউল) ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি, সেতার বাজাতে পছন্দ করতেন। আবার স্থানীয় মসজিদে দানও করতেন।” এই ধরনের খুনগুলোর পেছনে জড়িতদের সরকার খুঁজে বের করতে সক্রিয় হবে, সেই প্রত্যাশাও করেন বার্নিকাট।

এ ছাড়া ঢাকার ফ্রান্সের দূতাবাস জানায়, “বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রেজাউলকে হত্যা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত।”

ফ্রান্সের পক্ষ থেকেও দ্রুত তদন্ত করে খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।