রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুন, সন্দেহ জঙ্গিগোষ্ঠীকে ঘিরে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.04.23
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
160423-BD-professor-1000 অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম।এপ্রিল ২৩, ২০১৬।
এএফপি

অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে (৬১) গলা কেটে হত্যা করেছে। অতীতে লেখক-প্রকাশক ও ব্লগারদের যেভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অধ্যাপক রেজাউলও শনিবার একই কায়দায় খুন হলেন।

এ থেকে পুলিশের ধারণা, কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। তবে ওই গোষ্ঠী সম্পর্কে সরকার বা পুলিশ কোনো ধারণা দিতে পারেনি।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) হত্যার দায় স্বীকার করেছে। জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ’ এর টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টে শনিবার বলা হয়, ‘নিরীশ্বরবাদে আহ্বান করার জন্য’ এই শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে।

গত এক যুগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হলেন চার অধ্যাপক। ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বরে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস, ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক তাহের, ২০১৪ সালের নভেম্বরে অধ্যাপক শফিউল ইসলাম এবং সর্বশেষ গতকাল শনিবার সকালে অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী খুন হলেন।

নৃশংসভাবে হত্যার শিকার এই অধ্যাপকেরা মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীলতায় বিশ্বাসী ছিলেন।এখন পর্যন্ত কোনো হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয়নি।

“একজন শিক্ষক শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। এভাবে একের পর এক শিক্ষককে হত্যার ঘটনা আমাদের হতাশ করছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি,” বেনারকে জানান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক আবুল কাশেম।

ওই অধ্যাপক আরও বলেন, “আমরা চাই প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।”

হত্যার পর রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় নিহতের পুত্র রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেছেন।মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

“ধারণা করা যায়, উগ্র ও জঙ্গিগোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। আগের হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের মিল পেয়েছে পুলিশ,” বেনারকে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।

এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, উগ্রবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। সরকার গুরুত্বের সঙ্গে এসব ঘটনা উদ্‌ঘাটন ও দোষীদের শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

“প্রাথমিক ধারণা হচ্ছে, ইসলামি চরমপন্থীদের হাতে ওই অধ্যাপক খুন হয়েছেন। পুলিশ খুনিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে,” সাংবাদিকদের জানান রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন।

শনিবার সকাল সাড়ে সাতটায় ক্লাস নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে শহরের শালবাগান এলাকায় নিজের বাসার কাছে রেজাউল করিমকে হত্যা করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপুড় হয়ে পড়েছিল তাঁর মরদেহ। ঘাড়ে কোপ দেওয়া হয়েছে। এতে গলার সামান্য অংশ বাদে পুরোটাই কেটে গেছে।

পুলিশ জানায়, দুজন যুবক একটি মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করে চলে যায়।

শিক্ষকের মৃত্যুর খবর পেয়ে শত শত লোক তাঁর গ্রামের বাড়িতে ভিড় করে। প্রতিবেশী ও নিহত শিক্ষকের স্বজনেরা জানান, গ্রামে তাঁদের কোনো শত্রু নেই।

রেজাউল করিমের স্ত্রী হোসনে আরা সাংবাদিকদের বলেন, “আমার স্বামীর কোনো শত্রু থাকতে পারে না। আমি চাই খুনিরা যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়।”

রেজাউল করিমের দুই ছেলেমেয়ে। মেয়ে শতভী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। ছেলে সৌরভ রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র।

প্রতিবাদমুখর ক্যাম্পাস, ধর্মঘটের ডাক

হত্যার প্রতিবাদে শনিবার দিনভর প্রতিবাদমুখর ছিল ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।

দোষীদের শাস্তি দাবিতে ইংরেজি বিভাগ রোববার থেকে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি গতকাল বেলা ১২টা থেকে ক্লাস বর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ রোববারও এ ক্লাস বর্জন কর্মসূচি চলবে।

ঘটনার প্রতিবাদে ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গতকাল বেলা সোয়া ১০টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা।

সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে কান্নাজড়িত শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, “এত ভালো একজন মানুষ এভাবে মারা যাবেন, এটা কীভাবে মেনে নেব?”

তিনি বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেন বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। এখানে একের পর এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা ঘটছে। আমরা আর কোনো হত্যা দেখতে চাই না।”

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর

অধ্যাপক রেজাউলকে কুপিয়ে হত্যার খবর গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে। প্রতিটি সংবাদেই স্থান পেয়েছে ‘ব্লগার হত্যার ধরনের সঙ্গে মিল’ নিয়ে পুলিশের দেওয়া বক্তব্য।

‘রাজশাহীতে বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে বিবিসি।

সংবাদ সংস্থা এএফপি তাদের খবরের শিরোনাম করেছে, ‘সন্দেহভাজন ইসলামপন্থীদের হামলায় বাংলাদেশি অধ্যাপককে কুপিয়ে হত্যা’। এতেও বলা হয়, পুলিশ বলছে এর আগে ব্লগার ও নাস্তিকদের ওপর ইসলামী উগ্রপন্থীদের হামলার সঙ্গে এই হামলার মিল রয়েছে।

খবরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক চম্পা প্যাটেলকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, কর্তৃপক্ষের অবশ্যই এইসব হত্যাকাণ্ডের ইতি টানার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

‘সন্দেহভাজন ইসলামী উগ্রপন্থীদের দ্বারা বাংলাদেশি অধ্যাপক খুন’—এমন শিরোনাম করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

কেউ নিরাপদ নন

ক্ষমতাসীন দলের নেতা ছাড়া ‘দেশে কেউ নিরাপদ নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার ।বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শনিবার নিজের ফেইস বুক পেজে এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ এনেছেন।

ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আবারও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক খুন! কে হচ্ছে না খুন? বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, স্কুল ছাত্র, কলেজ ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, গৃহকর্মী, লেখক, প্রকাশক, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত? কে বাদ আছে? যখন সকলেই অনিরাপদ তখন ড. রেজাউল করিম ধর্ম প্রচারক ছিলেন নাকি উদার মানসিকতার ছিলেন, এটা ফালতু আলোচনা।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।