দেড় শতাধিক মামলার পুনঃশুনানির সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.04.29
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
2016-04-29-ব্জীগস620.jpg সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশের মূল ফটক। এপ্রিল ২০১৬।
বেনার নিউজ

বিচারকদের অবসরের পর পূর্নাঙ্গ রায় লেখা নিয়ে গত প্রায় চারমাস ধরে চলমান বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে দেড় শতাধিক মামলার পুনঃশুনানির সিদ্ধান্তে। এ ধরণের উদ্যোগ বিচার বিভাগের ওপর বিশেষ করে সর্বোচ্চ আদালতে কী ধরণের সিদ্ধান্ত ফেলতে পারে, তা নিয়ে সন্দেহ–সংশয় শুরু হয়েছে।

তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা মামলার পুনঃশুনানির সিদ্ধান্তকে ‘সময়োপযোগী ও সঠিক’ বলে মত দিয়েছেন আইনজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এর মাধ্যমে অবসরে যাওয়ার পর বিচারপতিদের রায় লেখার সংস্কৃতি বন্ধ হবে।

দেশের ইতিহাসে রায় ঘোষণার পর পুনঃশুনানির এই ঘটনা বিরল বলে জানিয়েছেন আইনজ্ঞরা। তাঁরা মনে করছেন, এর ফলে বিচারপ্রার্থীরা কিছুটা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। তা ছাড়া নতুন শুনানির পর আগের রায় বদলে গেলে  সম্ভাবনাও থাকছে।

তবে মোটাদাগে বছরের পর বছর রায়ের সুফল না পাওয়ার চেয়ে পুনঃশুনানির মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত হওয়াকেই বেশি জরুরি মনে করছেন আইনজ্ঞদের কেউ কেউ।

“পুনঃশুনানি হলে বিচারপ্রার্থী বা বাদি-বিবাদি কিছুটা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। কারণ মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবীদের ফিস দিতে হয়। তবে যেহেতু এসব মামলার রায় হয়ে গেছে, সেহেতু আইনজীবীরা খরচের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তাছাড়া আগে শুনানি হওয়া বিষয়গুলো বিচারপতিরা আলোচনা করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন,” বেনারকে জানান সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মহসীন রশীদ ।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই সর্বোচ্চ আদালতে রায় ঘোষণার পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা ১৬৮টি মামলা সুপ্রীম কোর্টের ওয়েবসাইটে পুনঃশুনানি তালিকায় দেখা যায়। যেগুলোর মধ্যে ১৬১টি মামলার রায় লেখার দায়িত্বে ছিলেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত ও আলেচিত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। বাকি সাতটি মামলার রায় লেখার দায়িত্ব ছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বাণীতে অবসরের পরে রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এরপর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। পক্ষে–বিপক্ষে বির্তক চলছে ওই সময় থেকে।

সেই সূত্র ধরেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা। তবে সংশ্লিষ্ট বিচারপতিরা মনে করছেন, ওইসব মামলার পুনঃশুনানি হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, “রায় ঘোষণা করা মামলার পুনঃশুনানি হলে আগের রায় বাতিল হয়ে যাবে। একাধিক বিচারপতি এসব মামলার রায় দিয়েছিলেন। বিচারপ্রার্থীরাও রায় শুনেছেন। এখন ওইসব মামলার পুনঃশুনানি হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।”

প্রতিহিংসা থেকে প্রধান বিচারপতি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উল্লেখ করে শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, কোনো এক বা দুই ব্যক্তির ওপর প্রতিশোধ নিতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বা বিচার বিভাগের সম্মান নষ্ট করার অধিকার কারো নেই।

তবে বিচারপতি মানিকের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে আইনজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এ সিদ্ধান্ত সার্বিকভাবে বিচার বিভাগের জন্য সুফল বয়ে আনবে। অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে আর বিতর্ক থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রীম কোর্টের জ্যেষ্ঠ্য আইনজীবী মহসীন রশিদ বলেন, “ওই ১৬৮টি মামলার পুনঃশুনানির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধান বিচারপতি সঠিক কাজ করেছেন। এটা আরো আগেই করা উচিত ছিল।”

তিনি বলেন, অবসরের যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারপতিদের শপথ শেষ হয়ে যায়। এরপর ওই বিচারক কোনভাবেই রায় লিখতে পারেন না। এ সিদ্ধান্ত শতভাগ সঠিক। আশা করি এরপর আর কোন বিচারক রায় লেখার কাজ ফেলে রাখবে না।

একই অবস্থা হাইকোর্টেও বিরাজ করছে জানিয়ে আক্ষেপের সুরে মহসীন রশিদ আরো বলেন, সুপ্রীম কোর্টের চেয়ে হাইকোর্টে অনেক বেশি রায় ঝুলে আছে। যেগুলো দুই থেকে পাঁচ বছর ধরেও লেখা হচ্ছে না। বিচারপ্রার্থীরা বছরের পর বছর ধরে রায় পাচ্ছে না, আপিল করতে পারছে না। রিভিউও করতে পারছে না। কখনও বিচারপ্রার্থী বিচার না পেয়েই মারা যাচ্ছে। প্রধান বিচারপতিকে ওইসব বিচারকদের কাছ থেকে রায় ফেরত আনার ব্যবস্থা নিতে হবে।

পুনঃশুনানির সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে সাবেক অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বেনারকে বলেন, “এমন সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে বিচারপতির অবসরে যাওয়ার পর আর কোন রায় লেখা হবে না। যাওয়ার আগে সবাই পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়া শেষ করবে।”

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবনতির প্রতিফলন এই ভোগান্তি।

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে থেকে জানা গেছে, আগামী ২ মে আপিল বিভাগের দুটি বেঞ্চের কার্যতালিকায় ওই ১৬৮টি মামলা পুনঃশুনানির জন্য রাখা হয়েছে।এগুলোর মধ্যে ১০৭টি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ও বাকি ৬১টি মামলা জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চে পুনঃশুনানির জন্য রাখা হয়েছে।

এম কে রহমান বলেন, “রায় যেটা ঘোষণা হয়েছে, সেটা কয়েক বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। রায়ের সুফল বিচারপ্রার্থীরা ভোগ করতে পারেনি। সে বিবেচনায় পুনঃশুনানির সিদ্ধান্ত ভালই বলতে হবে। তবে এক্ষেত্রে রায় পরিবর্তন হতেও পারে, নাও হতে পারে। যাই হোক না কেন বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। এটাই অনেক বড় পাওয়া।”

এদিকে অবসরে যাওয়ার আগের কয়েক মাস বিচারপতিদের বাকি থাকা রায় লেখার জন্য সময় দেওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন আইনজীবীরা।

এ প্রসঙ্গে মহসীন করিম বলেন, “কোন বিচারক কখন অবসরে যাবেন তা প্রধান বিচারপতি বা রেজিস্ট্রার অবগত থাকেন। প্রধান বিচারপতির উচিত তাদের ২-৩ মাস আর কোন শুনানির কোর্টে না বসিয়ে রায় লেখার জন্য সময় দেওয়া। এতে করে যাওয়ার আগে সব কাজ শেষ করে যেতে পারবেন তাঁরা।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।