খুনের ঘটনাগুলোকে সরকার বলছে ষড়যন্ত্র, অন্যরা বলছে সরকারের ব্যর্থতা

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.04.26
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
Xulhash-followup620.jpg দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে সমকামিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা দুই ব্যক্তি জুলহাস মান্নান ও নাট্যকর্মী কে. মাহবুব রাব্বী তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে। দাফনের আগে তাঁদের মরদেহ। এপ্রিল ২৬, ২০১৬।
ফোকাস বাংলা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কলাবাগানে ঘরে ঢুকে দুজনকে হত্যাসহ সাম্প্রতিক গুপ্ত হত্যার ঘটনাগুলোকে সরকার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলেই মনে করছে। তবে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, এটা ব্যর্থতা ঢাকার প্রয়াস মাত্র।

এসব হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি বড় ঘটনা নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য চলছে। তাঁকে হত্যা ও অপহরণ ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সাংবাদিক শফিক রেহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা নিয়েও সব মহলে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের সরকারবিরোধী সাম্প্রতিক বিভিন্ন মন্তব্যে বিব্রত সরকার। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরি, কুমিল্লা সেনানিবাসে কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরকারকে বেকায়দায় আছে।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী জানান, পরিকল্পিত গুপ্ত হত্যাগুলোর পেছনে মূল কারণ রাজনীতি। সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এসবের লক্ষ্য।

তবে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এও মনে করেন, সবকিছুর পরও হত্যাকাণ্ড বন্ধ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে না পারলে মানুষ এই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ বিশ্বাস করবে না।

সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, এ ধরনের গুপ্ত হত্যা ঠেকানোর মতো সক্ষমতা সরকারের কোনো বাহিনী এখনো দেখাতে পারেনি। আরও দুশ্চিন্তা হচ্ছে এ পর্যন্ত যতগুলো গুপ্ত হত্যা হয়েছে এর সঙ্গে জড়িত, মদদদাতা কিংবা অর্থদাতা কোনো কিছুরই পূর্ণাঙ্গ চিত্র কোনো সংস্থার হাতে নেই।

গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জন প্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম  মঙ্গলবার দলের ধানমন্ডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এটা সরকার সহজে মেনে নেবে না।

অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গতকাল সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মোহসীন বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে যা ঘটছে তা একদিকে দুঃখজনক, অন্যদিকে ঘটনাগুলো নিয়ে যে রাজনীতি হচ্ছে তা আরও দুঃখজনক।

“দেখুন, এমন রোমহর্ষক ঘটনার পর রাজনীতিবিদেরা একে অপরকে দায়ী করছেন। বাসার পাশে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের লাশ পড়ে থাকছে, ঘরে ঢুকে দুটি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মানুষ আতঙ্কিত। এটা বিপজ্জনক লক্ষণ,” বেনারকে জানান আমেনা।

জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে নাগরিক সমাজকে উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

আলোচনায় নিজামীর রায়

সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যোগসূত্র থাকতে পারে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জামায়াতে ইসলামির আমির মতিউর রহমান নিজামীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রিভিউ সম্পন্ন হবে। ফাঁসির রায়ও কার্যকর হতে পারে দ্রুততম সময়ের মধ্যে।

এর আগেও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকরের আগেভাগে গুপ্তহত্যা ও হামলার বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।

‘টার্গেট কিলিং’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং কারারক্ষী খুনের পর এসব ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গত সোমবার তার ওই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর কলাবাগানে ঘরে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাস মান্নান ও নাট্যকর্মী কে. মাহবুব রাব্বী তনয়কে ।

গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে বলছেন, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে ‘টার্গেট কিলিং’ হচ্ছে। এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যোগসূত্র থাকার ইঙ্গিত করেছেন তিনি।

দায় স্বীকার

জুলহাস ও তনয় হত্যার দায় স্বীকার করেছে আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা ‘আনসার আল ইসলাম’। গতকাল মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে আনসার আল ইসলামের নামে খোলা টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় এ দায় স্বীকারের বার্তা প্রচার করা হয়।

আনসার আল ইসলামের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ শাখার মুজাহিদীনেরা বাংলাদেশে সমকামিতা প্রসারের পথিকৃৎ, সমকামীদের গুপ্ত সংগঠন রূপবানের পরিচালক জুলহাস মান্নান ও তাঁর সহযোগী মাহবুব তনয়কে হত্যা করেছে।’

এই বিবৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বেনারকে বলেন, “এর ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না। এর আগে দায় স্বীকারের ঘটনায় যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে ঘটনায় জড়িত থাকার কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি।”

জোড়া খুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আগামী ২৪ মে দিন ধার্য করেছেন আদালত। গতকাল ঢাকার মহানগর হাকিম নুরুন্নাহার ইয়াসমিন এ আদেশ দেন।

হত্যার মিছিল থামাতে হবে

রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা হত্যার এই মিছিল থামানোর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বেনারকে বলেন, প্রতিটি নৃশংস ঘটনায় বিরোধী দলকে দায়ী করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, “সরকা​র বলছে আইএস বা আল কায়েদা এসব কাজ করছে না। তাহলে আপনারা প্রমাণ করুণ এসব কাজ কে বা কারা করছে। সরকারকে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে দোষীদের খুঁজে বের করতে হবে।”

“হত্যা বন্ধের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার আইএস বা আল কায়েদা প্রসঙ্গে বিতর্ক সৃষ্টি করছে। মানুষের নীরবতাও এ দেশে জঙ্গিবাদকে উৎ​সাহিত করছে,” জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, দুর্বৃত্তরা প্রথমে তারা ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের টার্গেট করেছিল। এখন তাদের টার্গেট সম্প্রসারিত হয়েছে। সংখ্যালঘু, সংস্কৃতি কর্মী, ছাত্র এবং সমকামিদের হত্যা করছে তারা। এটা যে কোনো মূল্যে থামাতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।