ঈদ করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আট দিনে নিহত ৮৮

কামরান রেজা চৌধুরী
2018.06.18
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
স্বজনদের সাথে মিলতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরমুখী মানুষের ঈদ-যাত্রার চেষ্টা। স্বজনদের সাথে মিলতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরমুখী মানুষের ঈদ-যাত্রার চেষ্টা। ছবিটি ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে তোলা। ১৪ জুন ২০১৮।
এপি

মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে ঈদ পালন করতে গিয়ে গত আট দিনে সারা দেশে ৮৮ জন যাত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

অর্থাৎ, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে প্রতিদিন গড়ে আটজন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের এসআই শহীদুল ইসলাম বেনারকে জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, রোববার নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে ১০ জনসহ পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ২০ যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন।

এ ছাড়া সোমবার মাগুরা ও ঠাকুরগাঁও জেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় দুজন করে মোট চারজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা।

মাগুরা জেলার শালিখা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বেনারকে বলেন, রোববার রাতে একজন ও সোমবার দুপুরে দুজনসহ পৃথক দুর্ঘটনায় জেলায় মোট তিনজন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন সোমবার বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারান মমতাজ আলী (৩৫) ও তাঁর শিশু কন্যা সুমাইয়া (৪)।

রবিউল ইসলাম বলেন, মমতাজ আলী তাঁর স্ত্রী শাপলা বেগম ও কন্যা সুমাইয়াকে নিয়ে একটি ভ্যানে করে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিলেন। আনুমানিক দুপুর ১২টার দিকে একটি যাত্রীবাহী বাস ভ্যানটিকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই সুমাইয়া মারা যায়।

পরে তার বাবা মমতাজ আলী মারা যান। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন শিশু কন্যার মা।

ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ মিয়া বেনারকে বলেন, সোমবার সকালে ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর জেলার সীমান্তে বিআরটিসি বাস ও আরেকটি বাসের সংঘর্ষে বিআরটিসি বাসের হেলপার ও সুপারভাইজার ‍দুজনই নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দুর্ঘটনা প্রতিবেদন আলাদাভাবে তৈরি করে। সংস্থাটির ২০১৬ ও ২০১৭ সালের হিসাব বলছে, দুই বছরে ঈদুল ফিতরে প্রাণ গেছে ৪৬০ জনের। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৩৪ জন। দুই বছরে ঈদুল আজহায় সড়কে প্রাণ ঝরেছে ৫০২ জনের। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৭৪৯ জন।

গত দুই বছর ঈদের আগে পরের ১২ দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই হিসাব তৈরি করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তাঁদের হিসাবে, গত দুই বছরের চার ঈদে মোট প্রাণহানি হয়েছে ৯৬২ জনের। প্রতিদিন গড়ে সড়কে প্রাণ গেছে ২০ জনের।

কেন এত দুর্ঘটনা?

প্রতি বছর ঈদে এক সপ্তাহের ব্যবধানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকা ও অন্যান্য শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যান। দু-এক দিন পর ঈদ শেষে তারা দলে দলে একইভাবে কর্মস্থলে ফিরতে রাস্তায় নামেন।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা মো. সেলিম বেনারকে বলেন, প্রতি ঈদে প্রায় এক কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়েন। সরকারি অফিস ও গার্মেন্টস ছুটি হওয়ার পর অর্থাৎ দুই তিন দিনের ব্যবধানেই বেশির ভাগ মানুষ ঢাকা ছেড়ে যান। যারা শেষ সময়ে ভ্রমণ করেন তাঁদের অধিকাংশই দরিদ্র অথবা স্বল্প আয়ের মানুষ।

তিনি বলেন, “এক সাথে দু থেকে তিন দিনের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে পরিবহন করার মতো দীর্ঘ রুটে চলা প্রয়োজনীয় সংখ্যক যানবাহন আমাদের নেই। সে কারণে যেসব গাড়ি শহরে লোকাল যাত্রী পরিবহন করে তারাও ঈদের মৌসুমে দীর্ঘ রুটে যাত্রী নিয়ে যায়।”

তিনি বলেন, ঈদের সময় মানুষের গ্রামের বাড়ি যাওয়া এবং কর্মস্থলে ফিরে আসার যে তাগিদ সে কারণেই তারা যেকোনো ধরনের গাড়িতে উঠে ভ্রমণ করে।

আবার প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরিবহন শ্রমিক নেই। সুতরাং, একই শ্রমিককে দিনরাত কাজ করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, সাধারণত দিনে আট/নয় ঘণ্টায় ঢাকা থেকে রংপুর যেতে পারে। কিন্তু ঈদের আগে পরে ২২ থেকে ২৬ ঘণ্টা লেগে যায়। একটি ট্রিপ দিয়ে আবার তাদের রওনা দিতে হয়। সে কারণে, শ্রমিকদের পক্ষে সঠিকভাবে যানবাহন পরিচালনা করা সম্ভব হয় না; দুর্ঘটনা ঘটে।

সেলিম বলেন, এসব লোকাল গাড়ির ড্রাইভার ও হেলপারেরা হাইওয়ে ভালোভাবে চেনে না। সুতরাং, গাড়িগুলো দুর্ঘটনায় পড়ে। শুধু যাত্রী নয়, ড্রাইভার বা হেলপারেরাও মারা যাচ্ছে; পঙ্গু হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঈদ শেষে অধিকাংশ মানুষ চাকরি রক্ষা করতে একসাথে আবার ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরগুলোতে ফিরে আসে। সুতরাং, শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

শনিবার ও সোমবার ঢাকা-রংপুর হাইওয়ে ভ্রমণকালে দেখা যায়, ঢাকা শহরে চলাচলকারী প্রজাপতি পরিবহন, মোহনা পরিবহন, তেঁতুলিয়া পরিবহনসহ ভাঙাচোরা গাড়িতে চেপে হাজার হাজার মানুষ ভ্রমণ করছেন। যাত্রীদের একটি বড় অংশ ঝুঁকি নিয়ে ছাদে ভ্রমণ করছেন।

ঈদের দিনও হাজার হাজার দরিদ্র মানুষকে সাভার থেকে চন্দ্রা মোড় পর্যন্ত ব্যাগ নিয়ে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

ঈদের দিনে কেন বাসের অপেক্ষা—এমন প্রশ্নের জবাবে রংপুরগামী যাত্রী শাকিলা বেনারকে বলেন, “গতকাল চেষ্টা করে টিকিট পাইনি। তাই, আজ বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার ভাতিজা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এবার ঈদের দিনে দেখা হলো না। আজ গেলে হয়তো আগামীকাল বাবা-মাকে দেখতে পাব।”

শনিবার ঢাকা থেকে গাইবান্ধাগামী গোবিন্দগঞ্জ এক্সপ্রেসে ভ্রমণকারী যাত্রী আব্দুল মোতালেব বেনারকে, “বাসের ভেতরে ভাড়া পাঁচ’শ। আর ছাদে দুইশো। তাই যাচ্ছি।”

সোমবার সকাল পর্যন্ত যমুনা ব্রিজের আগে পরে কয়েকটি ট্রাক-গাড়ি উল্টে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তা মাসুদ রানা বেনারকে বলেন, “দেখুন আমরা বাসের ছাদে যাত্রা বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। কিন্তু ঈদের মৌসুমে গাড়ির চাপ এত বেশি থাকে যে একটি গাড়ি থামালে পুরো হাইওয়ে অচল হয়ে যায়।”

ওই কর্মকর্তা বলেন, “আবার কোনো গাড়ি আটকাতে গেলে যাত্রীরা গালমন্দ শুরু করে। তারা কথা শোনে না। অনেকেই বলেন, আমাদের জীবন নিয়ে আপনার এত দরদ কেন! সুতরাং, আমরা ইচ্ছা করলেও ঈদের মৌসুমে ব্যবস্থা নিতে পারি না।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন