শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা, নির্যাতনের অভিযোগ

কামরান রেজা চৌধুরী ও প্রাপ্তি রহমান
2018.08.06
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
180806_BD_protest_1000.JPG তথ্য প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তারের পর মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে কোর্টে হাজির করা হয়। ৬ আগস্ট ২০১৮।
বেনারনিউজ

অপহরণের ১৯ ঘণ্টা পর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও দৃকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল আলমকে সোমবার বিকেলে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

শহিদুলের বিরুদ্ধে চলমান ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘অপপ্রচার’ চালানোর অভিযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। শহিদুল নিজে তাঁর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন, যদিও পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মাসুদুর রহমান বেনারকে বলেন, “রোববার দিবাগত রাত একটায় শহিদুল আলমকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে।”

এর বেশি তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং ‘ভীতি ও সন্ত্রাস’ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে শহিদুলের বিরুদ্ধে।

কোথায় ছিলেন শহিদুল?

বিকেলে শহিদুল আলমকে আদালতে উপস্থাপন করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এ সময় তাঁর পা ছিল খালি। ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও জ্যোতির্ময় বড়ুয়া খ্যাতিমান এ আলোকচিত্রীর জামিন আবেদন করেন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে। আদালত সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালতের অনুমতিক্রমে শহিদুল তাঁকে তুলে নেওয়ার পরবর্তী ১৯ ঘণ্টা কেমন কেটেছে সেই বিবরণ দেন। তিনি বলেন, রোববার রাতে তিনি কাজ করছিলেন। দোরঘন্টি বাজতেই একটা ছোট্ট মেয়ে প্রথমে জানতে চায়, তিনিই শহিদুল আলম কি না।

পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২৫/৩০ জন তাঁকে লিফটের কাছে নিয়ে যায় ও গাড়িতে তোলে। এর পরপরই তাঁর চোখ বেঁধে হাতকড়া পরানো হয়। সারারাত তাঁকে ওই অবস্থায় রাখা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে অপমানসূচক কথা বলা হয় ও মারধর করা হয়।

শহিদুলকে যখন আদালতে নেওয়া হচ্ছিল তখন উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

“ওরা আমাকে মেরে রক্তাক্ত করেছে। এই পাঞ্জাবিতে রক্ত লেগেছিল। সেটা ধুয়ে আবার পরতে দিয়েছে,” শহিদুল আলম বলেন।

অন্যদিকে আদালতের উপপরিদর্শক মাহমুদুর রহমান বলতে থাকেন, শহিদুল আলম যা বলছেন তা কল্পনাপ্রসূত। পাল্টা প্রশ্ন তোলেন এই বলে যে, আহত হলে তিনি কথা বলছেন কী করে?

এর আগে সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে শহিদুল আলমের স্ত্রী ও লেখিকা রেহনুমা আহমেদ বলেন, তাঁর স্বামীকে রোববার রাত দশটায় ধানমন্ডির বাসা থেকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে।

রেহনুমা জানান, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। বাড়ির মালিক ও নিরাপত্তা প্রহরীর কাছে জানতে পারেন, ৩০ থেকে ৩৫ জন যুবকের একটি দল শহিদুলকে জোর করে একটি হাই-এইস গাড়িতে তোলে। তারা বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে যায় এবং ক্যামেরার ওপর কালো টেপ আটকে দেয়।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে গত শনি ও রোববার বেশ কয়েকবার ফেইসবুক লাইভে আসেন তিনি।

পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, এর আগে শহিদুল আল-জাজিরা টেলিভিশনে চলমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে সাক্ষাতকার দেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের দেশ শাসন করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সোমবার দৃক গ্যালারি শহিদুলের মুক্তি চেয়ে একটি বিবৃতি দেয়। শহিদুল আলমের মুক্তি চেয়ে প্রফেসর আনু মুহাম্মদ ওই বিবৃতিতে বলেন, “জনগণের কাছে ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সরকারের। সরকার কেন এমন ভূমিকা পালন করছে? কেন এই ভণ্ডামি? ...কেন একের পর এক নাগরিককে আক্রমণ করা হচ্ছে?”

গুজব ছড়ানোর দায়ে আরও গ্রেপ্তার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটিয়ে সহিংসতার আহবান জানানোর অভিযোগে গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার অপরাধ বিভাগ তিনজনকে আটক করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো মাহবুবুর রহমান আরমান (৩০), আলমগীর হোসেইন (২৭) ও সাইদুল ইসলাম (৩১)।

সাইবার অপরাধের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাজমুল ইসলাম তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

“আমরা গ্রেপ্তারকৃতদের পাঁচদিনের রিমান্ডে পেয়েছি। তাদের কাছ থেকে আরও আরও তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করছি,” নাজমুল ইসলাম বলেন।

এদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)র কর্মকর্তা মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেছেন, তাঁরাও জনগণের কাছ থেকে গুজব রটনাকারীদের ব্যাপারে তথ্য আহ্বান করেছেন।

গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে খুদে বার্তা পাঠিয়েছে। ওই বার্তায় বলা হয়, “রাজধানীর ঝিগাতলায় ছাত্র হত্যা ও ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনার কোনো সত্যতা নেই। বিষয়টি পুরোপুরি গুজব। এতে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না।”

মন্ত্রিসভায় সড়ক পরিবহন বিল অনুমোদন

সড়ক পরিবহন বিল-২০১৮ এর খসড়া সম্পর্কে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, বর্তমানে কার্যকর ১৯৮৩ সালের মোটর ভেহেকল অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন বিল অনুযায়ী, সড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যু অথবা আহত করার সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যদি দুর্ঘটনা তদন্তে দেখা যায় যে চালক ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন তাহলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা প্রযোজ্য হবে। ৩০২ ধারা মোতাবেক মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

পরিবহন নেতা ও নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান বেনারকে বলেন, “কোনো চালক ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটাতে চায় না। অনেক সময় পথচারীরদের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটে। আবার অনেকসময় যান্ত্রিক ক্রটি অথবা রাস্তার সমস্যার জন্য দুর্ঘটনা ঘটে।”

তিনি বলেন, দুর্ঘটনা হলেই চালকের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

নবম দিনে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ

এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি ছাত্রসংগঠন ও পুলিশের হামলার প্রতিবাদে সোমবারও রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজ, স্বায়ত্ত্বশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এই আন্দোলনে যুক্ত হয় দেশের বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

দুপুরের পর রাস্তায় নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি সড়ক পরিবহন আইনের যে খসড়া সোমবার মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে, সেখানে দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির পরিমাণ কম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদিত ওই খসড়া আইনে দুর্ঘটনার শাস্তি পাঁচ বছর রাখা হয়েছে।

অন্যান্য দিনের মতো আন্দোলনের নবম দিনে ছাত্রদের ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে। পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এতে আহত হয়। পুলিশ কমপক্ষে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে আটক করেছে।

তবে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেও পাল্টা হামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।

পুলিশ প্রতিবাদকারীদের রাস্তায় দাঁড়াতে দেয়নি। রামপুরায় ইস্ট ওয়েস্ট, বসুন্ধরায় নর্থ সাউথ ও বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে ও জলকামান ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

ইস্ট ওয়েস্টের ছাত্র মামুন বেনারকে বলেন, “দুপুর ১২টার দিকে কোনো প্রকার উস্কানি ছাড়াই পুলিশ আমাদের ওপর টিয়ারগ্যাস সেল ও লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাসের বেনারকে বলেন, সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় সড়ক দুর্ঘনার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে পাঁচ বছর করা হয়েছে। তারা এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, “কোনো অপরাধ ছাড়াই পুলিশ আমাদের পিটিয়েছে।”

শাহবাগ থানার ওসি আবুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ শাহবাগ এলাকা থেকে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের ব্যাপারে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে তারা কোনো অপরাধের সাথে জড়িত কি না।

তবে রোববার ১২ সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় কাউকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি। গ্রেপ্তার হয়নি শনিবার রাতে মোহাম্মদপুরে বিদায়ী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাটের গাড়ি আক্রমণের ঘটনায় জড়িত কেউ।

বিকেলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, হামলাকারীদের নাম ঠিকানা পেলে তিনি বিচার করবেন। তবে তারা ছাত্রলীগের কি না, সেটি আগে প্রমাণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।