নতুন জাতীয় বাজেট: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রাধান্য

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.06.09
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
নতুন জাতীয় বাজেট: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রাধান্য জাতীয় বাজেটের ২৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়ার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র সমাবেশ। ৯ জুন ২০২২।
[বেনারনিউজ]

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক টালমাটাল অর্থনীতি, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া, বাণিজ্য ঘাটতি ও রেমিটেন্স প্রবাহ কমে আসাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম. মুস্তাফা কামাল। প্রতি বছরের মতো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে এবার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 মোট ছয় লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের চেয়ে এটা শতকরা ৬৯ ভাগ বেশি।

২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা থেকে নতুন বাজেটের আকার প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের শেষ ভাগ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য বেড়ে যেতে শুরু করে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে বলে বাজেট উপস্থাপনকালে সংসদে জানান অর্থমন্ত্রী।

সম্প্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৩ ডলারে পৌঁছেছে, বিশ্ববাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য অন্তত ১২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, তেল-গ্যাসের পাশাপাশি বিশ্ব পণ্য বাজারে রাশিয়া ও ইউক্রেন গুরুত্বপূর্ণ দেশ। দেশ দুটি গম, ভুট্টা, সূর্যমুখী তেল ও বিরল মাটির অন্যতম সরবরাহকারী দেশ।

মন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালে উন্নত দেশসমূহে মূল্যস্ফীতি তিন দশমিক এক ভাগ যা ২০২২ সালে পাঁচ দশমিক সাত শতাংশে দাঁড়াবে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে ২০২২ সালে মূল্যস্ফীতি আট দশমিক সাত শতাংশে দাঁড়াবে। গত বছর এই হার ছিল পাঁচ দশমিক নয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি শতকরা পাঁচ থেকে ছয় ভাগ রয়েছে।

“এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি হিসাবে অভ্যন্তরীণ বাজারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা,” বলেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় পণ্য; জ্বালানি তেল, এলএনজি, গম, রাসায়নিক সার, পামওয়েল, সয়াবিন তেল, কয়লা, ভুট্টা ও চাল আমদানি করতে গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে।

“এসব পণ্যের বাইরেও আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের মূল্য এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতির চাপ অনুভূত হচ্ছে,” বলেন অর্থমন্ত্রী।

সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

জ্বালানী, খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশে ইতোমধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব প্রবল হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন।

গত ৫ জুন ঢাকার মিরপুর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভে অংশ নেয়া এপিলিয়ন গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক মো. সুমন বেনারকে বলেন, “মাত্র ১১ হাজার টাকা বেতন দেয় আমাদের। যে চাল ৫০ টাকা কেজি ছিল, তা এখন ৭০ টাকা। এক লিটার তেলের দাম ২০০ টাকার বেশি। আমরা কীভাবে চলব?”

বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন, এবারের বাজেটে সরকার দেশের ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেটি আসলে ঠিকই আছে বলে আমি মনে করি।

তিনি বলেন, ২০২১ সালের আগস্ট থেকে সারাবিশ্বে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির দাম ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারাবিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

“বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। আমাদের এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে তাকালে চলবে না,” বলেন অধ্যাপক মইনুল।

তাঁর মতে, সরকার সঠিকভাবেই এবার প্রবৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দিয়েছে। “মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসবে।”

এই অর্থবছরে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ৮০ বিলিয়ন ও এর বিপরীতে রপ্তানি আয় সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ডলার হবে জানিয়ে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, “আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ফারাক হবে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থায় আমাদের আমদানি কমাতে হবে যাতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ না পড়ে। এ ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হবে।”

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার বিলাসদ্রব্য আমদানি বন্ধ ও অত্যাবশ্যকীয় নয়, এমন পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি “সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত” বলে মনে করেন অধ্যাপক মইনুল।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সাম্প্রতিক সময়ে টাকার বিপরীতে ডলার অবমূল্যায়নের বিষয়টি “আরেকটি বড়ো চ্যালেঞ্জ” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বেশ কিছুদিন ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ক্রমশই কমছে।”

“এক ডলারের বিপরীতে ৮৬ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ১০৪ টাকা পর্যন্ত গেছে। এভাবে যদি ডলারের দাম বাড়তে থাকে তাহলে আমদানি খরচ বাড়বে এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাবে। সুতরাং, ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে হবে,” বলেন তিনি।

 তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে লক্ষ্যের কথা অর্থমন্ত্রী বলেছেন সেটি তাঁর প্রস্তাবিত কর কাঠামো অনুযায়ী সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

তাঁর মতে, বাজেটের প্রস্তাবিত শুল্ক কাঠামোতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের “তেমন প্রতিফলন নেই।”

উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, “নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আমদানি শুল্ক তেমন কমানো হয়নি। ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে। তাহলে মুদ্রাস্ফীতি কমবে কীভাবে? কিছুদিন আগে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে শুল্ক ছাড় দেয়া হয়। বাজেট প্রস্তাবে তেমন কিছু নেই।”

 অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, “মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতায় যদি বাড়তি অর্থ দেয়া যেত, তাহলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে সেখান থেকে বেতন ও পেনশনের অর্থ বাদ দিলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ আগের চেয়ে কমেছে।”

 বিদেশে পাচার করা টাকা বৈধ করার সুযোগ

২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সে অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থিত কোনো সম্পদের ওপর কর পরিশোধ করা হলে আয়কর বিভাগসহ সরকারের কেউ এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে না।

এ ছাড়া বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি দেশে আনলে এর ওপর ১৫ শতাংশ, অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষত্রে ১০ শতাংশ এবং নগদ টাকার ওপর ৭ শতাংশ কর বসানোর সুপারিশ করছেনে অর্থমন্ত্রী।

এতে করে বাজেটে “টাকা পাচারকারীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে,” মন্তব্য করে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটি কখনও মেনে নেয়া যায় না।”

এদিকে “বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে সুযোগ দেয়া হয়েছে সেটি কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না,” বলে মন্তব্য করলেও অধ্যাপক মইনুল ইসলামের মতে, “বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে কিছুটা হলেও লাভ আসতে পারে।”

তবে অতিরিক্ত জরিমানা দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার বিদ্যমান যে সুযোগ, তা আর রাখছে না সরকার। এর পরিবর্তে বিদেশে পাচার করা টাকা কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।