যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াডে’ অংশ না নিতে বাংলাদেশকে সতর্ক করল চীন

জেসমিন পাপড়ি ও কামরান রেজা চৌধুরী
2021.05.10
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘কোয়াডে’ অংশ না নিতে বাংলাদেশকে সতর্ক করল চীন বেইজিং সফরকালে বৈঠকের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনার সাথে করমর্দন করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (ডানে)। ৫ জুলাই ২০১৯।
[এএফপি]

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে অবাধ নৌ চলাচল সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চার দেশীয় জোট কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘যথেষ্ট খারাপ’ করবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

সোমবার বাংলাদেশে কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিকাবের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনায় এক প্রশ্নের জবাবে এমন মন্তব্য করেন চীনা রাষ্ট্রদূত। 

এই জোটে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে সতর্ক করে চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, “এ ধরনের ছোট গোষ্ঠী বা ক্লাবে যুক্ত হওয়ার ভাবনাটা ভালো নয়। বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে তা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট খারাপ করবে।” 

উল্লেখ্য, কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ বা কোয়াডের সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। বেইজিং একে চীনবিরোধী একটি ছোট গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে। 

লি জিমিং বলেন, “চীন সব সময় মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কোয়াড হচ্ছে চীনবিরোধী একটি ছোট গ্রুপ। আমি খুব স্পষ্ট করেই বলতে চাই, অর্থনৈতিক প্রস্তাবের কথা বললেও এতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উপাদান আছে।”

“ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, এ ধরনের অংশীদারি আমাদের প্রতিবেশীদের নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের মঙ্গলকে নিশ্চিতভাবে ব্যাহত করে,” বলেন চীনের রাষ্ট্রদূত। 

ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ চলাচল ‘অবাধ ও স্বাধীন’ রাখার উপায় খোঁজার যুক্তিতে ২০০৭ সালে কোয়াডের আলোচনা শুরু হয়। ২০১৭ সাল থেকে এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। তবে ২০২০ সালে জাপানের টোকিওতে দুদিনব্যাপী বৈঠকের পরে এই জোট নতুন করে আলোচনায় আসে।

প্রাথমিকভাবে কোয়াড কোনো একটি দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত না হলেও গত মার্চে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নেতাদের বৈঠকে “চীনের সম্ভাব্য হুমকি” সম্পর্কে আলোচনা হয় বলে গত এপ্রিলে গণমাধ্যমে জানান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলভিয়ান।

গত ২৭ এপ্রিল কয়েক ঘণ্টার সফরে ঢাকা আসেন চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেঙ্গহি। এ সময় তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের সাথে পৃথক বৈঠক করেন।

ওই সফরের পর চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ–চীন সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। 

এতে আরও বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় বাইরের কোনো শক্তির সামরিক জোট গঠনের চেষ্টা এবং আধিপত্য বিস্তার রুখতে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দুই পক্ষের যৌথ প্রয়াস চালানো উচিত।

রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠকে কোয়াডের বিষয়ে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের সহযোগিতা চান এবং বাংলাদেশেকে ওই জোটে অংশ না নিতে অনুরোধ করেন বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গত ৪ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বৈঠকে আমি উপস্থিত না থাকলেও পরে জানতে পারি, চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোয়াডে যোগদানের বিষয়টি উল্লেখ করেন।” 

গত ২৭ এপ্রিল বৈঠককালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ “মনোযোগের সঙ্গে” চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শুনলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি বলে ওই বৈঠকে উপস্থিত রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বেনারকে জানিয়েছিলেন।

তবে বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে তিনি অনুমোদিত নন বলে নিজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন ওই কর্মকর্তা। 

এদিকে এখন পর্যন্ত “বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি,” জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেনারকে বলেন, “আমরা এই জোট সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।” 

কোয়াডে যোগ না দিতে চীনের ওই অনুরোধের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে সোমবার চীনা রাষ্ট্রদূত কোনো জবাব দেননি। 

‘সকলের সঙ্গে বন্ধুতা কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’

কোয়াডে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সোমবার বেনারকে বলেন, “শান্তি ও উন্নয়নের জন্য হলে পৃথিবীর যেকোনো জোটে যোগ দিতে আমরা কোনো সমস্যা দেখি না।”

“তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে থাকবে না। কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে কোনো জোটে থাকবে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী সকলের সঙ্গে বন্ধুতা কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়,” বলেন ওই কর্মকর্তা। 

কোয়াডে অর্থনৈতিক প্রস্তাবের কথা বললেও এতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উপাদান আছে চীনা রাষ্ট্রদূতের এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই কর্মকর্তা বলেন, “কোয়াড কী করছে, সে কতটুকু ফর্মাল হবে, সেটা নির্ভর করবে এটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর।”

“কিন্তু কোনো ফরমাল জোট হিসেবে এটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এরা (সদস্য রাষ্ট্রগুলো) যার যার নিজের পলিসি স্ট্যান্ড পয়েন্ট থেকে প্রমোট করছে-ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসেফিক,” বলেন ওই কর্মকর্তা। 

তিনি জানান, “বাংলাদেশের এখনো কোয়াডে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসেনি। তবে এর প্রতিটি সদস্য দেশের সাথেই চীনের সমস্যা রয়েছে। তাই এমন কয়েকটি দেশের জোটের কথা উঠলে চীনের উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।” 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এহসানুল হক বেনারকে বলেন, “কোয়াডের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো গত এক বছরে চীন সম্পর্কে বিভিন্ন নেতিবাচক মতামত দিয়েছে। সুতরাং এই জোটের বিষয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া দেখানো খুব স্বাভাবিক। চীনারা এই জোটকে তাদের জন্য হুমকি মনে করে।”

এই জোটে অংশ না নিতে বাংলাদেশের প্রতি চীনের পরামর্শকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বার্তা’ মনে করছেন এই কূটনৈতিক বিশ্লেষক। 

এহসানুল হক বলেন, “স্বাধীন দেশ হিসেবে কোথায় যোগ দেবে বা না দেবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। কিন্তু বন্ধুরাষ্ট্র চীনকে অবহেলা করা যাবে না। তাই চীন যখন আপত্তি তুলেছে তখন বাংলাদেশকে সতর্কভাবে এগুতে হবে। যদিও বাংলাদেশ এখনো যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়নি।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন