প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: প্রত্যাশার তুলনায় আর্থিক সহায়তা কম

জেসমিন পাপড়ি
2024.07.10
ঢাকা
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: প্রত্যাশার তুলনায় আর্থিক সহায়তা কম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিংয়ের 'গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ এ পৌঁছুলে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এ সময় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং উপস্থিত ছিলেন (বামে)। ১০ জুলাই ২০২৪।
[সৌজন্যে: তথ্য অধিদফতর]

রিজার্ভ সংকট মোকাবেলা, নতুন বাজেটের ঘাটতি পূরণ ও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পাঁচ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাইলেও এক বিলিয়ন ডলার সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে চীন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সহায়তা যথেষ্ট নয়। অর্থের বিকল্প ব্যবস্থা করতে না পারলে সামনে কঠিন সময় পার করতে হবে বাংলাদেশকে।

বেইজিং সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বুধবার চীনের রাষ্ট্রীয় ভবন গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এই সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন বলে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

তিনি জানান, বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহায়তা ও বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে আরো পণ্য আমদানির আশ্বাস দেন।

চীন যে অর্থ সহায়তা ঘোষণা দিয়েছে তা বাংলাদেশের চাওয়ার তুলনায় “অত্যন্ত সামান্য,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

বাংলাদেশ কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভের অবস্থা এত খারাপ, বাজেটরি সাপোর্টের জন্য সরকার চেয়েছে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। সেখানে পাওয়া গেলো মাত্র এক বিলিয়ন ডলার। অর্থ না পেলে আমরা অবশ্যই চাপে পড়ব।”

প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাছান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক খাতে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে চীনের সাথে “আলোচনা চলছে।”

অর্থ সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের প্রতি বাংলাদেশের আস্থা বেশি থাকলেও চীন বাংলাদেশের চাহিদা মতো “অফার করতে পারেনি,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. এহসানুল হক।

তাঁর মতে, “এতে করে রিজার্ভ সংকট মোকাবেলায় প্রত্যাশিত সমাধান” না আসলেও অর্থ সহায়তার জন্য “চীনই বাংলাদেশের একমাত্র উৎস নয়।” সরকারের সংশ্লিষ্টরা এক্ষেত্রে নিশ্চয় বিকল্প খুঁজে বের করবেন।

চার ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেবে চীন

হাছান মাহমুদ জানান, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, তাঁর দেশ বাংলাদেশকে চারটি ক্যাটাগরিতে—অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ, রেয়াতি ঋণ ও বাণিজ্যিক ঋণ দিয়ে সাহায্য করবে।

বুধবার বিকেলে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রতি শি জিন পিং তাঁর সমর্থন অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আর্থিক সহায়তার ধরন বিষয়ে দুই দেশের কারিগরি কমিটি একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেবে এবং চীনের একটি কারিগরি কমিটি শিগগির বাংলাদেশ সফর করবে বলেও জানান তিনি।

বুধবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে দুই দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, লি কিয়াং বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় চীন। এই প্রেক্ষাপটে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, ওষুধ ও সিরামিক পণ্য আমদানির অনুরোধ জানান। জবাবে চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আরও পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেন।

বৈঠকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বজুড়ে মানবতা সমুন্নত রাখতে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।

চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বরাদ্দ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আরও চীনা বিনিয়োগের আহ্বান করেছেন—জানান হাছান মাহমুদ।

আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির কথা উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। এতে সমর্থনের আশ্বাস দেন চীনের প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়া, চীনের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃঢ় সহায়তা দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তবে চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের ব্যাপারে কিছু জানানো হয়নি।

ঢাকা-বেইজিং ২২ এমওইউ সই

সরকারি বার্তাসংস্থা বাসস এক প্রতিবেদনে জানায়, বুধবার বাংলাদেশ ও চীন দুই দেশের মধ্যে বুধবার ২২টি সমঝোতা স্মারক ও দলিল সই হয়েছে। এছাড়া সাতটি ঘোষণা পত্রও সই হয়। সই হওয়া দলিলের মধ্যে দুটি নবায়ন করেছে ঢাকা-বেইজিং।

অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতে সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষি পণ্য রপ্তানি, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে এসব দলিল সই হয়।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পৌঁছালে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

বুধবার বিকেলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্টে শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ২৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এছাড়া সরকারের সঙ্গে প্রায় ২৫–২৭ বিলিয়ন বা ২৫০০–২৭০০ কোটি ডলারের মতো অনুদান, ঋণ এবং বেসরকারিখাতে আরো কিছু সমঝোতার আওতায় সবমিলিয়ে ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি আসে।

সফরসূচি অনুযায়ী ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা থাকলেও চীন সফর শেষ করে একদিন আগেই বুধবার রাত সাড় বারোটার দিকে দেশে ফিরে আসেন বলে জানায় বাসস।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।