বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে

আহম্মদ ফয়েজ
2021.12.13
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে ঢাকা সফরের সময় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি (বামে) তাঁর পাশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। ০৯ এপ্রিল ২০২১।
[বেনারনিউজ]

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ না পাওয়া নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং এর ভিডিও বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসার ঘটনায় ছোট দেশটি ঘিরে বড়ো দুটি শক্তির অপ্রকাশ্য টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে।

এর আগে শুক্রবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে শনিবার ঢাকার প্রতিবাদ জানানোর ঘটনায় বিশেষজ্ঞরা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত পাচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এসব ঘটনাবলি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ অবস্থানে ধাক্কা দিয়েছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বিনিয়োগ সহায়ক দেশ হিসেবে ক্ষমতাসীনদের কাছে একটু বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলেই তাঁদের অভিমত।

“র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও চীনা রাষ্ট্রদূতের ভিডিও বার্তার নানা কারণ আছে। দুই দেশই নিজ নিজ স্বার্থে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তাই বাংলাদেশকেও কূটনৈতিক মূলনীতি ঠিক রেখে সতর্কতার সাথে এগোতে হবে,” বেনারকে বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জো বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ না পাওয়া নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং এর ভিডিও বার্তাটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। গত শুক্রবার লি জিমিং বাংলাদেশস্থ চীনা দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে ওই ভিডিও বার্তাটি প্রকাশ করেন। এতে তিনি প্রশ্ন রাখেন-যুক্তরাষ্ট্র কি গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করার যোগ্যতা রাখে?

বাংলাদেশের বড়ো বড়ো প্রকল্পগুলোর অংশীদার হিসেবে চীনা রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য ‘রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ’ এবং বাংলাদেশকে অবশ্যই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রেখে এগোতে হবে বলে মনে করেন ড. ইমতিয়াজ।

ওই ভিডিও বার্তায় চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেয়া এক বিবৃতিতে শনিবার বিরোধী দল বিএনপি বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে চীনকে ‘গণবিচ্ছিন্ন জবরদস্তিমূলক অবৈধ সরকার’ নয়, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানায়।

যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার বেনারকে বলেন, “গণতন্ত্র সম্মেলনে আমন্ত্রণ না পাওয়া এবং সর্বশেষ র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। এটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য দুর্ভাগ্য।”

চীনা রাষ্ট্রদূতের ভিডিও বার্তা

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক তড়িঘড়ি করে আয়োজিত তথাকথিত গণতন্ত্র সম্মেলন বেশ ধুমধাম করে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ যখন এ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখন চীন অন্য একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে: প্রকৃত গণতন্ত্র কী? যুক্তরাষ্ট্র কি গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করার যোগ্যতা রাখে?” ভিডিও বার্তায় বলেন লি জিমিং।

“চীন বিশ্বাস করে যে, একটি দেশ গণতান্ত্রিক কিনা তা নির্ভর করে তার জনগণ সত্যিকার অর্থে সে দেশের মালিক কিনা তার ওপর। জনগণকে যদি শুধু ভোট দেওয়ার জন্য জাগানো হয় কিন্তু তার পরেই তাঁরা আবার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় প্রবেশ করে, যদি প্রচারের সময় তাঁদের একটি গান ও নৃত্য দেওয়া হয় কিন্তু নির্বাচনের পরে তাঁদের কোনো বক্তব্য না থাকে, অথবা যদি ভোট চাওয়ার সময় তাঁদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়, কিন্তু নির্বাচনের পরে তাঁরা উপেক্ষিত হন, এমন গণতন্ত্র অবশ্যই প্রকৃত গণতন্ত্র নয়,” বলেন এই রাষ্ট্রদূত।

তিনি বলেন, “একটি দেশ গণতান্ত্রিক কি না তা বিচার করবে সে দেশের জনগণ, বাইরের কোনো নিজস্ব-শৈলীর বিচারক নয়।”

“বিস্তীর্ণ সমাজতান্ত্রিক আধুনিকীকরণের পথে, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার চীন জনগণের গণতন্ত্র বিকাশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের গল্পটিও এক, দেশটি আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। একটি সরকারসহ একটি দেশ, যার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে তা যদি গণতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃত না হয়, তাহলে হয়তো গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটি পুনর্মূল্যায়ন করার অথবা এই সংজ্ঞার পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে,” ভিডিও বার্তায় বলেন লি জিমিং।

রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বিস্মিত বিএনপি

চীনা রাষ্ট্রদূতের ভিডিও বার্তাটি প্রকাশের পরদিন শনিবার বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বর্তমান অবৈধ সরকার সম্পর্কে” চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে “গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর মতো আমরাও ক্ষুব্ধ এবং বিস্মিত।

“বাংলাদেশের জনগণ যখন তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারে সোচ্চার, বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠন সমূহ যখন লাগাতারভাবে এই সরকারকে হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়ে চলছে, ঠিক তখনই গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকারের পক্ষে দেয়া এই বাস্তবতা বিবর্জিত বক্তব্য দেশের মানুষকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও আহত করেছে,” বলা হয় বিবৃতিতে।

বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত দাবি করে বিএনপি বলে, “অর্জিত সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা আদায়ের সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহকে স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের পথে বর্তমান ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীই আজ সবচেয়ে বড়ো বাধা। সরকারের কর্তৃত্ববাদী এই আচরণের কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি আজ একটি গণধিকৃত ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।”

“চীন তার নিজ দেশে কী ব্যবস্থা বহাল রাখবে তা একান্তই তার অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ঐতিহ্যগতভাবে অবাধ নির্বাচন ও প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার চর্চার মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানা চর্চা করেছে ও করবে। কেননা প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার প্রয়োগই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রাণ এবং জনগণের ক্ষমতা চর্চার একমাত্র মাধ্যম, যার মাধ্যমেই রাষ্ট্র জনগণের কাছে জবাবদিহিতায় আবদ্ধ থাকে। এটাই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণতন্ত্র চর্চার সার্বজনীন পন্থা,” বিবৃতিতে বলা হয়।

বিএনপির এই বিবৃতি সম্পর্কে বক্তব্য চানতে চেয়ে ইমেইল পাঠিয়েও ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ‘রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ

ড. ইমতিয়াজ বেনারকে বলেন, “চীনা রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের যত বেশি উন্নয়ন হবে ততই উন্নত দেশগুলোর নজর এখানে বাড়তে থাকবে। এই নজর সবসময় ইতিবাচক নাও হতে পারে।”

“কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সাম্প্রতিক যে ঘটনাবলী ঘটছে বাংলাদেশকে সেগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। অবশ্যই সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে খেয়াল রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই যেন অন্য কোনো দেশে নিজেদের প্রভাব খাটাতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে না পারে,” বলেন ইমতিয়াজ।

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ।

এদিকে সোমবার আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় জোট নেতারা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সম্মেলনে বাংলাদেশকে নিমন্ত্রণ না দেয়ার বিষয়টিকে দেশটির ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়।

একইসঙ্গে ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে ‘তৃতীয়পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে’ দাবি করে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার এবং বন্ধু দেশগুলোর কাছে সব বিষয়ে ‘সঠিক তথ্যতুলে ধরার পরামর্শ দেন জোটের নেতারা।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

মন্তব্য

Md jahidul islam
2022-01-04 08:48

আসলেই তো বাংলাদেশে গনতন্ত্র নাই এদেশে সাধারন মানুষের ভোটের অধিকার নাই সাধারণ মানুষের বাক সাধীনতা এদেশে সংবাদ মাধ্যম গুলোও জিম্মি সাংবাদিকরা সব সত্য সংবাদ প্রকাশ করতে পারেনা এমিন একটা দেশে এমন একটা দেশে থেকে সব কিছু জেনে শুনে কি করে একজন রাষ্ট্রদূত বলতে পারে এই দেশে গনতন্ত্র আছে? আসলেই চীনা রাষ্ট্রদূত ক্ষমতাসীন দলের হয়ে কথা বলেছেন।।।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন