চীনসহ পাঁচ দেশ বাংলাদেশের কাছে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তেল বিক্রি করবে

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.01.12
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
চীনসহ পাঁচ দেশ বাংলাদেশের কাছে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তেল বিক্রি করবে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে জ্বালানি তেলবাহী ট‍্যাংকার। ২১ নভেম্বর ২০২১।
[ফোকাস বাংলা]

করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে অর্থনীতি ইতিবাচক ধারায় ফেরার প্রেক্ষাপটে দুই চীনা কোম্পানিসহ মোট পাঁচ দেশের ছয়টি কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা (এক বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনছে সরকার।

বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় জ্বালানি ক্রয় সংক্রান্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রস্তাবটি অনুমোদিত হওয়ার কথা বেনারকে নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: সামসুল আরেফিন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন, ছয় মাসের জন্য উল্লিখিত পরিমাণ জ্বালানি তেল যেসব দেশের কোম্পানি থেকে কেনা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে চীনসহ পাঁচটি দেশই এটা উৎপাদন করে না।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, চীন ছাড়াও থাইল্যান্ডের পিটিটিটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এনক, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি, মালয়েশিয়ার পিটিএলসিএল থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কেনার অনুমোদন দেয়া হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনসহ জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশ নয়, এমন দেশ থেকে জ্বালানি কেনার কারণে খরচ বেশি হবে। যদিও বিপিসির দাবি, তারা অর্থের সাশ্রয় করতেই উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেই জ্বালানি কিনছে।

বৃহস্পতিবার কমিটির সভায় অনুমোদিত বিপিসির প্রস্তাবের একটি কপি বেনারের হাতে এসেছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, চীনা কোম্পানি ইউনিপেক চায়না থেকে চার লাখ মেট্রিক টন ডিজেল, অকটেন ও জেট ফুয়েল কিনবে বিপিসি। এ জন্য ব্যয় হবে দুই হাজার ২৭৩ কোটি টাকা যা মার্কিন ডলারের হিসাবে প্রায় ২৬৬ মিলিয়ন।

আরেকটি কোম্পানি পেট্রোচায়না থেকে ৯৬৭ কোটি টাকা (প্রায় ১১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে এক লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি ক্রয় করবে বিপিসি।

দুটি প্রস্তাবই কমিটি অনুমোদন দিয়েছে বলে জানান শামসুল আরেফিন।

জ্বালানি কেনা বাবদ মোট আট হাজার ৪১৭ কোটি টাকার প্রস্তাবের মধ্যে দুই চীনা কোম্পানি সরবরাহ করবে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি যার আর্থিক মূল্য ৩৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

এর আগে পাঁচটি দেশের ওই ছয় কোম্পানির কাছ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ১০ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল কিনেছিল বাংলাদেশ। পাঁচ হাজার ১৪২ কোটি ৫১ লাখ টাকা অর্থমূল্যের সেই সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে ওই বছরের জুন মাসে।

চীন জ্বালানি উৎপাদনকারী নয়

চীন জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ নয়, বরং দেশটি বিভিন্ন উৎপাদনকারী দেশ থেকে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম কিনে পরিশোধন করে বিক্রি করে বলে বেনারকে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ. মনসুর।

“তাদের পরিশোধন ক্ষমতা অনেক বেশি,” বলে জানান তিনি।

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করে জ্বালানি তৈরি করা ছাড়াও বাংলাদেশ কুয়েত থেকে পরিশোধিত জ্বালানি কিনে থাকে বলে বুধবার বেনারকে জানান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এ.বি.এম. আজাদ।

এর বাইরে “পরিশোধিত জ্বালানি ক্রয়ের ব্যাপারে চীন, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে সরকারি পর্যায়ে আগে থেকে চুক্তি আছে,” বলে জানান তিনি।

“সেই চুক্তি অনুযায়ী, আমরা ইন্টারন্যাশনাল দরপত্র আহ্বান করেছি এবং চীনা কোম্পানি দুটির দর কম হওয়ায় তাদের কাছ থেকে জ্বালানি কেনা হচ্ছে,” বলেন চেয়ারম্যান আজাদ।

তিনি বলেন, “তারা তুলনামূলক কম দামেই দিচ্ছে। টাকা সাশ্রয়ের কারণেই আমরা চীনা কোম্পানি দুটির কাছ থেকে জ্বালানি ক্রয় করছি।”

করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধি পাবে।”

তিনি জানান, বাংলাদেশ প্রতি বছর কমপক্ষে ৬২ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর মধ্যে কমপক্ষে ১৩ লাখ অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম এবং ৪৯ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি।

এসব জ্বালানির মধ্যে রয়েছে ৪৩ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল, তিন লাখ মেট্রিক টন অকটেন এবং তিন লাখ মেট্রিক টন বিমানের জেট ফুয়েল।

এদিকে “চীন জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ নয়,” মন্তব্য করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বুধবার বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশের উচিত উৎপাদনকারী দেশ যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, আমিরাতের কাছ থেকে জ্বালানি কেনা।”

“চীন আরেকটি দেশ থেকে কিনে যদি আমাদের কাছে বিক্রি করে তাহলে খরচ অবশ্যই বেশি হওয়ার কথা,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সরাসরি উৎপাদনকারী দেশের কাছ থেকে জ্বালানি কেনা হলে খরচ কম পড়বে।”

তবে বিপিসি চেয়ারম্যান আজাদ বলেন, “চীনা কোম্পানিগুলো আমাদের শর্ত মোতাবেক পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করছে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে দেবো।”

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানি নির্ভর, নিজস্ব তেমন কোনো তেলক্ষেত্র নেই। জ্বালানির অন্যতম প্রাকৃতিক গ্যাস বাংলাদেশে রয়েছে। তবে সেই গ্যাসও ফুরিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।

গত ৫ জানুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ. কে. আব্দুল মোমেন জানান, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ অংশে গ্যাস হাইড্রেটের সন্ধান পাওয়া গেছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন