সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণীর বিধান বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান

অয়ন আমান
2024.07.02
ঢাকা
সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণীর বিধান বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সন্দিহান দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক, ঋণ খেলাপি, অর্থ পাচারকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারসহ আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে বাম গণতান্ত্রিক জোট বিক্ষোভ মিছিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে যেতে চাইলে রাজধানীর পল্টন মোড়ে পুলিশ বাধা দেয়। ২ জুলাই ২০২৪।
[সনি রামানী/বেনারনিউজ]

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবার সদস্যদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার আইনি বিধান মেনে চলতে উচ্চ আদালত আবার তাগিদ দিলেও আদেশ প্রতিপালন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, আদালতের আদেশ প্রশংসনীয় হলেও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

সরকারের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার দুর্নীতির ঘটনা একের পর এক উন্মোচিত হওয়ায় পুরোনো এই বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার বিদ্যমান বিধান (সরকারি চাকরিজীবী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯ এর ১৩ ধারা) কঠোরভাবে প্রতিপালনের আদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ।

পাশাপাশি, আগামী তিন মাসের মধ্যে এ সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও নির্দেশ দেয় বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী এবাদত হোসেনের এই হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনে আদালতের আদেশের প্রয়োজন হওয়াটা দুঃখজনক বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

আদালতের এই আদেশ প্রতিপালন নিয়ে “খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আমি দেখি না,” মন্তব্য করে তিনি বেনারকে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে যারা নিয়ম-কানুন তৈরি করেন, তাঁরা নিজেরাই সেগুলো ‘অবারিতভাবে, নির্মমভাবে’ লঙ্ঘন করে “আইন প্রতিপালন থেকে বিরত থাকেন।”

এর ফলে বাংলাদেশে “ক্ষমতার প্রবাহে দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তার হয় এবং হচ্ছে” জানিয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আদালতের আদেশ বাস্তবে কতটুকু প্রতিপালন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চে সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান রোধ করে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ সংশোধনের উদ্যোগ নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

দীর্ঘদিন থেকে ‘আইন লঙ্ঘন

সম্প্রতি সাবেক পুলিশ প্রধান, সেনাপ্রধান, রাজস্ব কর্মকর্তাসহ সরকারের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে এই আলোচনা গড়ায় জাতীয় সংসদে। অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজনে বিশেষ কমিশন গঠন করার দাবিও জানান।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সম্পদ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনে চিঠিও দেন একজন সংসদ সদস্য।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার আদেশ দেয় আদালত।

এদিকে, সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গতকাল উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস।

বেনারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী দেওয়ার “আইনি বাধ্যবাধকতা” থাকলেও “দীর্ঘদিন থেকে তাঁরা এই আইন লঙ্ঘন করে আসছিলেন। আইনের বিধান যাতে প্রতিপালিত হয় সে জন্য আমরা রিট আবেদন করেছি।”

রিট আবেদন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে অ্যাডভোকেট এ কে এম ফজলুল হক।

শুনানি শেষে দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদ অর্জন রোধে যথাযথ আইন প্রণয়নে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট।

আগামী ২২ অক্টোবর ওই রুলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আছে।

অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নেই

সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এর ১৩ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁর অথবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন বা দখলে থাকা শেয়ার, সার্টিফিকেট, সিকিউরিটি, বিমা পলিসি এবং মোট ৫০ হাজার টাকা বা এর বেশি মূল্যের গহনা, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা করবেন।

প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী প্রতি পাঁচ বছর পরপর প্রদর্শিত সম্পত্তির হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব বিবরণী যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের নিকট দাখিল করবেন।

বর্তমান সরকার অঙ্গীকার দিয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বেনারকে বলেন, “বর্তমান সরকার যখন ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে, তখন তারা নির্বাচনী ইশতেহারে দুইবার অঙ্গীকার করেছিল ক্ষমতাধরদের; যারা গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে, তাদের সম্পদের হিসাব দেওয়া হবে এবং প্রকাশ করা হবে।

“এটা শুধুই অঙ্গীকার রয়ে গেছে। নবম জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত একটি বেসরকারি বিল উত্থাপন করেছিলেন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী। সেটি পাস হয়নি। পরবর্তীতে সরকার এ বিধান শিথিল করার উদ্যোগ নেয়,” যোগ করেন সুজন সম্পাদক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সাদিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণ জমা দিতে হয়, এটি সাধারণ একটি আইন। আদালতের আদেশ বিস্তারিত জেনে তারপর এ ব্যাপারে মন্তব্য করব।”

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব ২১ কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে নোটিশ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এদিনই দুদক জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমান, তাঁর দুই স্ত্রী ও সন্তানদের সম্পদের বিবরণী জমা দিতে নোটিশ দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।