উপকূলে আঘাত করছে সিত্রাং, ভোলা ও ঢাকায় নিহত ২

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.10.24
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
উপকূলে আঘাত করছে সিত্রাং, ভোলা ও ঢাকায় নিহত ২ ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকূলে আছড়ে পড়ছে। ছবিটি সোমবার দুপুরে পতেঙ্গার আকমল আলী রোড এলাকার জেলেপাড়া থেকে তোলা। ২৪ অক্টোবর ২০২২।
[বেনারনিউজ]

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সাইক্লোন সিত্রাং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল অতিক্রম করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সময় সোমবার মধ্যরাত এবং মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে এটি উপকূলজুড়ে আঘাত করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম সোমবার রাত ১০টায় বেনারকে জানান, সিত্রাংয়ের অগ্রভাগ ভোলার আশপাশের এলাকা দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

জেলার দৌলতখান উপজেলায় সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় গাছ চাপায় বিবি খাদিজা (৮০) নামের এক নারী প্রাণ হারিয়েছেন বলে বেনারকে জানান জেলার ডেপুটি কমিশনার তৌফিক-ই-লাহী চৌধুরী।

এ ছাড়া ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায় ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে দেয়াল ধসে এক রিকশা চালক মারা গেছেনে বলে সোমবার রাতে সাংবাদিকদের জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্বরত পুলিশ ইন্সপেক্টর বাচ্চু মিয়া। তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের নাম জানাতে পারেনি পুলিশ।

সিত্রাং এর প্রভাবে সোমবার দিনভর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, স্থগিত করা হয়েছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা।

সিত্রাং এর প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরেও মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে সাইক্লোনের দাপট থাকার কথা জানিয়েছে স্থানীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাইক্লোন মোকাবিলায় সামগ্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বাসসকে এই তথ্য জানান। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা, মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়াসহ নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করার কথা জানান তিনি।

পাঁচ থেকে সাত ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে

আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, “সাইক্লোন বলতে আমরা মূলত এর কেন্দ্রকে বুঝি। আজ মধ্য রাতের মধ্যে সিত্রাং সমগ্র উপকূলে আঘাত করতে পারে।”

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিত্রাং পটুয়াখালী জেলার খেপুপাড়া অঞ্চল দিয়ে ধাবিত হয়ে বরিশাল অতিক্রম করার পর সেটি আবার চট্টগ্রাম অঞ্চল দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, সাইক্লোনটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার গতিবেগে উপকূলে আঘাত হানাতে পারে। তবে এর গতিবেগ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদেরা।

যেসব জেলা সাইক্লোন সিত্রাংয়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেগুলো হলো; সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার।

অধিদপ্তরের মতে, ওই সব জেলা ও এর দূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পাঁচ থেকে সাত ফুট বেশি উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

আতঙ্কে মানুষ

পটুয়াখালী জেলার উপকূলীয় এলাকা কলাপাড়ার বাসিন্দা অশোক মুখার্জি সোমবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে বেনারকে টেলিফোনে জানান, সেখানে রোববার মধ্যরাত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। মাঝখানে পাঁচ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও তা বন্ধ করে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, “প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে। চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেলেই বেড়ি বাঁধের বাইরের সব বাড়িঘর এবং পায়রা বন্দরের জেটিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ডুবে যাবে।”

অশোক মুখার্জি বলেন, “এখানকার পুরো অঞ্চল এখন অন্ধকারে। বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছুই বন্ধ।”

তিনি বলেন, “কলাপাড়া অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো উঁচু করে নির্মাণ করা। সাইক্লোনের সময় এগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়।”

বরিশাল শহরের বাসিন্দা এম. মোফাজ্জেল সোমবার সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে বেনারকে বলেন, পুরো বরিশাল শহর থমথমে। শহরের নিম্নাঞ্চল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা খুলনার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় বসবাসকারী কয়রা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে বেনারকে টেলিফোনে জানান, সন্ধ্যা থেকে নদীতে জোয়ার শুরু হয়েছে, বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে, নদীর পানিও বাড়ছে। কয়েকটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে।”

তিনি বলেন, “কয়রা এলাকায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ বসবাস করেন। আমরা সবাই আতঙ্কিত অবস্থায় সময় অতিবাহিত করছি। যদি পাঁচ থেকে সাত ফুট পানি বৃদ্ধি পায় তাহলে আমরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হব।”

কয়রার বাসিন্দা, গৃহিনী ও তিন সন্তানের জননী উম্মে সালমা পারভীন সোমবার বেনারকে বলেন, সকাল থেকেই সেখানে দমকা হাওয়াসহ অঝরে বৃষ্টি হচ্ছে। কপোতাক্ষ, শিবসা ও কয়রা নদীতে জোয়ার এসেছে।

তিনি বলেন, “শিশু ও বয়স্কদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া কঠিন। এ ছাড়া, হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল রয়েছে। সেগুলো ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া যায় না। মরি-বাঁচি বাড়িতেই থাকব।”

উম্মে সালমা বলেন, “আমরা আশ্রয়কেন্দ্র চাই না; আমরা চাই বেড়ি বাঁধ নির্মাণ করা হোক।”

image0.jpeg
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করার আগে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে মাইকিং করে লোকজনকে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি, শিবিরের দুর্বল ঘরগুলো বাঁশ ও রশি দিয়ে মজবুত করে বাঁধতে বলা হয়। ২৪ অক্টোবর ২০২২। [আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

অভ্যন্তরীণ নৌপথ বন্ধ

কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সকাল থেকে সাগর উত্তাল থাকায় জলোচ্ছ্বাসের আশংকায় সন্ধ্যার পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাইকিং করে মানুষজনকে সতর্ক করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে জেলার উপকূলবর্তী উপজেলাগুলোতে এক লাখ মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর আসেনি।

আবু সুফিয়ান বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং মোকাবিলায় ইতিমধ্যে জেলার ৫৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। মাঠে নামানো হয়েছে ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক। দুপুর থেকে তারা লোকজনকে ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে সতর্ক এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ জানাচ্ছেন।

বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের তোড়ে দেশের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের উপকূলে ঝড়ের কবলে পড়ে ১৩টি ট্রলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি সার্ভিস ট্রলার ও ১২টি মাছ ধরার ট্রলার। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বেনারকে বলেন, সোমবার সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্র উপকূলে এ ঘটনা ঘটে।

সাইক্লোন সিত্রাংয়ের প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশে দিনভর বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম. শাহজাহান সোমবার বেনারকে বলেন, সোমবার বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। জাহাজগুলোকে বহির্নোঙ্গর ও গভীর সমুদ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মুসা সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সিত্রাংয়ের কারণে মংলা বন্দরের কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। একইভাবে পায়রা বন্দরেও কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

সাইক্লোন সিত্রাংয়ের কারণে অভ্যন্তরীণ নৌপথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে সোমবার বেনারকে জানান বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর সদস্য ও যুগ্মসচিব মতিউর রহমান।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সিত্রাংয়ের প্রভাবে মঙ্গলবারও দেশের উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে সুনীল বড়ুয়া ও কলকাতা থেকে পরিতোষ পাল।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।