বাংলাদেশে গুম: স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের চাপ দিচ্ছে, পুলিশ বলছে ‘তদন্ত’

শরীফ খিয়াম
2022.01.14
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাংলাদেশে গুম: স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের চাপ দিচ্ছে, পুলিশ বলছে ‘তদন্ত’ গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান চেয়ে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে তাঁদের স্বজনদের মানববন্ধন। ৩০ আগস্ট ২০২১।
[বেনারনিউজ]

গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে সাজানো বক্তব্য আদায়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ দেওয়ার অভিযোগ শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে পুলিশ।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সংগঠন মায়ের ডাক এবং মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বৃহস্পতিবার পৃথক বিবৃতিতে হয়রানির ওই অভিযোগ তুলে এ ধরনের চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানায়।

এ ব্যাপারে পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে, “পুলিশের কার্যক্রমকে হয়রানি হিসেবে উল্লেখ করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার এবং এ সম্পর্কে একতরফা বিবৃতি প্রদান করা তদন্ত কাজে অসহযোগিতার নামান্তর।”

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও গণসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মো. ফারুক হোসেন সম্পাদিত ‘ডিএমপিনিউজ’ শুক্রবার ‘প্রতিবাদলিপি’ আকারে এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে।

মায়ের ডাক ও আসকের বিবৃতি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর প্রসঙ্গে প্রকাশিত খবর প্রসঙ্গে ডিএমপি বলেছে, “গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অতিরঞ্জিত এবং বিকৃত সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা প্রতীয়মান হয়।”

তবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের হয়রানি থামেনি বলে শুক্রবার বেনারকে জানিয়েছেন মায়ের ডাকের সংগঠক আফরোজা ইসলাম আঁখি ও সানজিদা ইসলাম তুলি। একই তথ্য জানান আসকের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান লিটন।

‘প্রায় প্রতিটি পরিবারেই পুলিশ গিয়েছে’

বেনারের সাথে গুম হওয়া একাধিক ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছে, যারা গত সপ্তাহে পুলিশের হয়রানির শিকার হয়েছেন।

“ঢাকায় গুমের শিকার হওয়া প্রায় প্রতিটি পরিবারেই পুলিশ গিয়েছে,” বেনারকে বলেন তুলি।

২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে গুম হওয়া তৎকালীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড (বর্তমানে ২৫ নম্বর) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলামের বোন তুলি জানান, গত সপ্তাহে তাঁদের বাড়িতে একাধিকবার পুলিশ এসেছিল।

“পুলিশ সদস্যরা নানাভাবে ভীতি প্রদর্শন করে অনেকের কাছ থেকে লিখিত বিবৃতি আদায় করে নিয়েছে,” অভিযোগ করে আঁখি বলেন, “ঢাকার বাইরে নোয়াখালীতেও তিনজন ভুক্তভোগী পুলিশের বয়ান অনুযায়ী বক্তব্য লিখে দিতে বাধ্য হয়েছেন।”

শনিবারে সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে মায়ের ডাক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেছে, যেখানে একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার উপস্থিত থাকবে বলেও বেনারকে নিশ্চিত করেছেন আয়োজকরা।

পুলিশের বক্তব্যে বলা হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তোলা গুম সংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ক তথ্য হালনাগাদ করার পাশাপাশি তদন্ত এগিয়ে নিতে ভিকটিমের পরিবার ও অভিযোগকারীদের সাথে যোগাযোগ বা তাঁদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করা হয়।

তবে মানবাধিকার কর্মী লিটন বলেন, “সম্ভবত জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের গুম বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ যে ৩৪ জনের ব্যাপারে সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিল, তাঁদের স্বজনদের কাছ থেকে এই সাজানো বক্তব্য আদায়ের চেষ্টা হচ্ছে।”

এদের ব্যাপারে গত ৯ ডিসেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বেনারকে বলেছিলেন, “ইউএন থেকে আমরা কিছু নাম পেয়েছি এবং সেগুলো নিয়ে তদন্ত করেছি। আমাদের বাহিনীগুলো তদন্ত করে এ ধরনের ঘটনার কোনো সত্যতা পায়নি।”

পুলিশের দাবি ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য

ডিএমপি জানায়, ঢাকার সবুজবাগ থানা এলাকার মাহবুব হাসান সুজন নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে গত সোমবার পুলিশ তাঁর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে। এ সময়ে সুজনের সহোদর ‘মো. শাকিল খান’ (মো. জাহিদ খান সাকিল) তাঁর ভাই নিখোঁজ হওয়ার স্থান সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন, যা সাধারণ ডায়েরিতে উল্লেখ নেই।

বাসাবোর আহাম্মদনগরে বাসিন্দা সাকিল শুক্রবার বেনারকে জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের নয়াকান্দি গ্রাম থেকে ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন সবুজবাগ থানা ছাত্রদলের সভাপতি সুজন। সাথে ছিল তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী কাজী ফরহাদ।

“সেখান থেকে একদল সশস্ত্র মানুষ সাদা মাইক্রোবাসে করে তাদের নিয়ে যায়। আমরা প্রথমে সোনারগাঁও থানায় অভিযোগ দায়েরের চেষ্টা করি। এতে ব্যর্থ হয়ে সবুজবাগ থানায় জিডি করতে হয়েছিল।”

“তবে আমার ভাই কোথা থেকে নিখোঁজ হয়েছে বা তাঁকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কারা নিয়ে গেছে তা জিডিতে উল্লেখ করতে দেওয়া হয়নি,” জানান তিনি।

“পরে জানতে পেরেছি, ওই সময়ে যারা এভাবে গুম হয়েছেন, তাঁদের কারো স্বজনই জিডিতে এসব তথ্য উল্লেখ করতে পারেননি,” যোগ করেন সাকিল।

পুলিশ জানায়, এ ব্যাপারে লিখিতভাবে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনের জন্য অনুরোধ করলে সাকিল ও তাঁর পিতা তা দিতে অস্বীকার করেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা গণমাধ্যমের কাছে মিথ্যাচার করেছেন।

একই ঘটনায় সুজনের সাথে নিখোঁজ হওয়া কাজী ফরহাদের বোন এবং ভগ্নীপতি নিখোঁজ সংক্রান্ত তথ্য লিখিতভাবে পুলিশকে দিয়েছেন।

“আমার সামনে ফরহাদ ভাইয়ের বোন-ভগ্নীপতি পুলিশের লিখে দেওয়া বক্তব্য তাঁদের নিজেদের হাতে লিখে দিয়েছেন। চাপ দিলে হয়তো আমিও এমনটা করতে বাধ্য হতাম,” বলেন সাকিল।

“জিডিটি আমার বৃদ্ধ বাবা আবদুল জলিল খান এন্ট্রি করার কারণে পুলিশ বাসায় এসে তাঁকে চাপ দেয়। জিডিতে তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন, তথ্য গোপন করেছেন-এমন অনেক কিছু লিখতে বলা হলেও বাবা লেখেননি,” বলেন তিনি।

এদিকে বাউনিয়া বাঁধ এলাকা থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া পল্লবী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক তরিকুল ইসলাম তারার পরিবারকে হয়রানির অভিযোগও অস্বীকার করেছে পুলিশ।

তবে তরিকুলের স্ত্রী বেবি আক্তারের বরাত দিয়ে মায়ের ডাকের আঁখি বেনারকে বলেন, “সোমবার তাঁকে ও তাঁর বাবাকে ডেকে নিয়ে রাতের বেলা দুই ঘণ্টা থানায় বসিয়ে রাখা হয়। পরে বৃহস্পতিবার তরিকুল গুম হওয়ার পর করা জিডিসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো চিঠির অনুলিপি বাসায় গিয়ে নিয়ে এসেছে তারা।”

এ প্রসঙ্গে পুলিশ অবশ্য বলেছে, “অভিযোগকারী বা ভুক্তভোগীর সাথে যোগাযোগ করা তদন্ত বা অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ।”

নূর খান লিটনের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‌্যাব-পুলিশের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা নিষেধাজ্ঞা গুম হওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে পুলিশের এই তৎপরতার অন্যতম কারণ হতে পারে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এইচআরডব্লিউ-র মানবাধিকার বিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিচারবহির্ভূত হত্যা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে আমলে নিয়ে তা নিরসনে উদ্যোগী হওয়ার আন্তরিকতা দেখায়নি আওয়ামী লীগ সরকার।”

“কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোরপূর্বক গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কখনো কখনো এই স্বজনেরা হেনস্তার শিকার হন,” উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর দেশের প্রায় ছয়শ মানুষকে গুম করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যের সাথে পুলিশের বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পরিবারগুলোকে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে তাঁদের বক্তব্য পরিবর্তন করে উক্ত ব্যক্তি 'নিখোঁজ' রয়েছে বলে উল্লেখ করার জন্য।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন