নাগরিকদের গুম করার দায়ে র‌্যাবকে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে নিষিদ্ধের দাবি

আহম্মদ ফয়েজ
2021.12.09
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
নাগরিকদের গুম করার দায়ে র‌্যাবকে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে নিষিদ্ধের দাবি মায়ের ডাক সংগঠনের আয়োজনে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরে পেতে তাঁদের ছবিসহ ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে স্বজনদের মানববন্ধন। ৩০ আগস্ট ২০২১ ।
[বেনারনিউজ]

বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক গুমের ঘটনা অধিকাংশই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে দাবি করে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে বাহিনীটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

তবে এই অভিযোগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যায়িত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা “গুমের কোনো ঘটনাই ঘটছে না।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার নিজেদের ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানায়, “বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের উচিত গুমের শিকার পরিবারগুলোর ওপর উৎপীড়ন বন্ধ করা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা গুম হওয়া ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারগুলোকে অবগত করা।”

বিবৃতিতে গুমের ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত চেয়ে বলা হয়, ইতোমধ্যে র‌্যাবের যেসব সদস্য জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত হয়েছেন, তাঁরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।

“বাংলাদেশ সরকারের উচিত জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের যারা এখনও নিখোঁজ তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস পালন করা,” বলেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস।

তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতিতে সামনে এগিয়ে যাবার একমাত্র পথ হচ্ছে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোর কষ্টের অবসান ঘটানো এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।”

“নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক গুমের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের মিথ্যা কথা কেউ বিশ্বাস করে না,” দাবি করে অ্যাডামস বলেন “এখন প্রশ্ন হলো দাতা গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘ এটি সম্পর্কে কী করতে যাচ্ছে।”

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে গুম হয়েছেন এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এমন ৮৬টি ঘটনা এইচআরডব্লিউ নথিভুক্ত করেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, “নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর দ্বারা নিয়মিত এই গুমের ঘটনাগুলোকে বাংলাদেশ সরকার বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।”

“জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দাতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারদের উচিত বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনীর সিনিয়র সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা এবং ভবিষ্যতে অপব্যবহার রোধে সহায়তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা,” বলা হয় বিবৃতিতে।

গত এক দশক ধরে গুমের ঘটনায় জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা যেসব উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন সেগুলোকে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না মন্তব্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অন্য যে কোনো বাহিনীর তুলনায় র‌্যাব বাংলাদেশে বেশি সংখ্যক জোরপূর্বক গুমের জন্য দায়ী।”

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে, যুক্তরাষ্ট্রের ১০ জন সিনেটর বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম এবং নির্যাতনের জন্য শীর্ষ র‌্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানিয়ে একটি দ্বিপাক্ষিক চিঠি প্রকাশ করেছেন।

প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের মতে, এইচআরডব্লিউ’র এই প্রতিবেদন “ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।”

“এই প্রতিবেদন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না,” মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক গুমের কোনো ঘটনাই ঘটছে না। এইচআরডব্লিউ যেসব সোর্সের ওপর নির্ভর করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে তারা সংস্থাটিকে মিসগাইড করেছে।”

“আমি আশা করব ভবিষ্যতে তারা নিজেদের মতো করে তদন্ত করবে এবং তারপর কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। অন্যথায় এইচআরডব্লিউ নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারবে না,” বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “ইউএন থেকে আমরা কিছু নাম পেয়েছি এবং সেগুলো নিয়ে তদন্ত করেছি। আমাদের বাহিনীগুলো তদন্ত করে এ ধরনের ঘটনার কোনো সত্যতা পায়নি।”

স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এসব মিথ্যা তথ্য ছড়ায় বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে, র‌্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

“আমি এই প্রতিবেদন দেখিনি। এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না,” বলেন আবদুল্লাহ।

গুম ব্যক্তিদের ঘরেই তাঁদের খোঁজা হয়!

গুম হওয়া ব্যক্তিদের বাসায় গিয়ে পুলিশ তাঁদের খোঁজ করছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন মায়ের ডাক এর সমন্বয়কারী আফরোজা ইসলাম আঁখি।

“গত দুই মাস আগে আমাদের বাসায় এসে পুলিশ আমার ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে খোঁজে। পুলিশ আমাদের কাছে জানতে চায় আমাদের ভাই বাসায় আছে কিনা। অথচ আমার ভাইকে র‌্যাব তুলে নিয়ে গুম করেছে ২০১৩ সালে,” জানান আফরোজা।

তিনি বলেন, “গুমের ভুক্তভোগী প্রায় একশটি পরিবার নিয়ে কাজ করছি আমি। আমাদের অনেকগুলো পরিবার অভিযোগ করেছে তাদের বাসায় পুলিশ গিয়ে একই কাজ করেছে।”

“স্বজন হারানোর শোকে আমাদের পরিবারগুলো ভীষণ কষ্টে আছে। তার মধ্যে আমাদের সঙ্গে এই ধরনের আচরণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে মোটেও প্রত্যাশিত নয়,” বলেন আট বছর ধরে নিখোঁজ ঢাকা বিএনপির নেতা সুমনের বোন আঁখি।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “গুমের অভিযোগগুলোকে তদন্তের জন্য সরকার এখন পর্যন্ত এমন কোনো ভূমিকা নেয়নি, যা ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আশাবাদী করে।”

স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্তের দাবি জানিয়ে নূর খান বলেন, “এই ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।”

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর দেশে প্রায় ৬০০ মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুমের শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে কাউকে কাউকে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

গত আগস্টে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে গুমের শিকার ৮৬ ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে তাঁদের বিষয়ে “যেখানে কোনো আলো পৌঁছায় না: বাংলাদেশে গুমের এক দশক” শিরোনামে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে এইচআরডব্লিউ।

শান্তি রক্ষা মিশনে র‍্যাব সদস্যদের নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে এইচআরডব্লিউর বিবৃতি সম্পর্কে মন্তব্য জানতে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের দপ্তরে বেনারের পক্ষ থেকে ইমেইল পাঠিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন