জেলখানায় লেখক মুশতাকের মৃত্যু: দেশে বিদেশে ক্ষোভ, প্রতিবাদ

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2021-02-26
Share
জেলখানায় লেখক মুশতাকের মৃত্যু: দেশে বিদেশে ক্ষোভ, প্রতিবাদ নয় মাস ধরে কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১।
[বেনারনিউজ]

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় কারাবন্দি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরও বেশি নাজুক করে তুলবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন লেখক-প্রকাশকরা। 

আগের রাতে কারাগারের ভেতর মুশতাকের মৃত্যুর খবরে শুক্রবার দেশের কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে, ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকার বিদেশি দূতাবাসগুলোসহ বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। 

মুশতাকের মৃত্যুর জন্য সরকারকে দায়ী করে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে। প্রতিবাদ জানাতে কয়েকটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি থেকে মশাল মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। 

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর সংসদের সভাপতি তাসিন মল্লিক সাংবাদিকদের জানান, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের ১০-১২ জনের বেশি নেতা–কর্মী পুলিশের হামলায় আহত হয়েছেন। 

এদিকে কারা হেফাজতে মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), কানাডাসহ মোট ১৩ দেশের রাষ্ট্রদূত। 

বেশ কয়েকবার জামিনের আবেদন নাকচ হওয়া এবং কারাবন্দি থাকার সময় মুশতাকের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করে যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, “আমরা বাংলাদেশ সরকারকে মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর সার্বিক পরিস্থিতির দ্রুত, স্বচ্ছ ও স্বতন্ত্র তদন্ত করার আহবান জানাচ্ছি।” 

গত বছরের মে মাসে মুশতাকের সাথে গ্রেপ্তার হওয়া কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কার্টুনিস্ট রাইটস নেটওয়ার্ক ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা এখন যথেষ্ট নিশ্চিত যে কার্টুনিস্ট কিশোরও মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁর তাৎক্ষণিক মুক্তি অপরিহার্য।” 

দেশটির আরেকটি সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) পৃথক বিবৃতিতে রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট কিশোরের মুক্তির পাশাপাশি মুশতাকের মৃত্যুর দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে। 

এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ছাড়াও হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) এবং কার্টুনিং ফর পিস তাঁদের মুক্তির দাবি জানিয়েছিল। 

“বিচারপূর্ব নয় মাস জেলে থেকে আজ মুশতাক আহমেদ মারা গেছেন, এই সময়ে ছয় বার তাঁর জামিনের আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়েছে, এবং এসব কিছু হয়েছে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় সরকারের কৌশলের সমালোচনা করে ফেসবুকে লেখার ‘অপরাধে’র দায়ে,” শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস। 

জেলখানায় মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় ছড়াকার ও প্রকাশক রবীন আহসান বেনারকে বলেন, “আমি মনে করি, এই মৃত্যু দেশকে আরো বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যাবে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও লেখালেখির জায়গাটা আরও সংকুচিত হবে।” 

Avijit-story.jpg
ছয় বছর আগে বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার যে ফুটপাতে জঙ্গিরা কুপিয়ে হত্যা করে, সেখানে তাঁর স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করছে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। [বেনারনিউজ]

অভিজিৎ হত্যার ছয় বছর

শুক্রবার ছিল জঙ্গি হামলায় নিহত বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। ছয় বছর আগে এই দিনে অভিজিৎ এবং একই বছরের ৩১ অক্টোবর ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা করেছিল জঙ্গিরা। 

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ এবং তার আগে ১০ ফেব্রুয়ারি দীপন হত্যা মামলার বিচারের পৃথক রায় ঘোষণা করা হয়। স্বাধীন মত প্রকাশ ও বই প্রকাশের কারণেই অভিজিৎ ও দীপন খুন হয়েছিলেন বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে জানায় আদালত। 

কিন্তু তাঁরা মারা যাওয়ার পর গত ছয় বছরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন লেখক-প্রকাশকেরা। 

“স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে বাংলাদেশ একটি কালো অধ্যায়ের দিকে যাচ্ছে, যেটা কখনোই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশকারী লেখকেরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও এখন কথা বলতে শঙ্কা বোধ করে,” বেনারকে বলেন কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা টোকন ঠাকুর। 

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ও সংসদ সদস্য মো. মাহবুব উল আলম হানিফ বেনারকে বলেন, “প্রতিদিন গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অনেকেই সরকারের সমালোচনা করছেন বা বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে যে যখন চাচ্ছেন, কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছেন।” 

তাঁর মতে, “যদি কারো কোনো বিষয়ে কথা বলতে শঙ্কা হয়ে থাকে, তাহলে এটা তার বা তাদের নিজেদের দুর্বলতা।” 

উল্লেখ্য, রাষ্ট্র ও সরকারের ভাবমূর্তি এবং সুনাম ক্ষুণ্ণের উদ্দেশ্যে সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগে গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন দেশে বাণিজ্যিক কুমির চাষের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত ৫৩ বছর বয়সী লেখক মুশতাক আহমেদ। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। 

“যে কোনো বিষয়ে স্বাধীন মত প্রকাশের অবস্থা এমনিতেই আর নেই বলা যায়। মুশতাকের মৃত্যু সেই অবস্থাকে আরও নাজুক করে দেবে,” বেনারকে বলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও লেখক আলী আর রাজি।

তাঁর মতে, “এ ধরনের অমানবিকতার নানা রকম ‘চেইন-রিয়াকশান থাকে। শেষ পর্যন্ত তা কেবল ব্যক্তির মত প্রকাশকে নয়, সমাজ-রাষ্ট্রকেই ধ্বংস করে দেয়।” 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একই মামলায় কারাগারে আছেন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। কিশোরের ভাই লেখক ও সাংবাদিক আহসান কবির বেনারকে বলেন,“ মুশতাকের এই মৃত্যু রাষ্ট্রীয় অনাচার।” 

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের গত ২৫ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ বা তাঁদের পরিবার কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করার কারণে ২০২০ সালে ১৪২ জনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এবং ১৩ জনকে পুরোনো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

“বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এই মামলাগুলো দায়ের করেছে এবং আদালত গ্রেপ্তারকৃতদের জামিন দিতে অস্বীকার করেছে,” বলেছে অধিকার। 

এ ছাড়া করোনাকালে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করাসহ দমন পীড়ন বেড়েছে উল্লেখ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) গত ১০ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৩০টি মামলায় ২৭১জন অভিযুক্ত হয়েছে। 

বিচারেও বাড়েনি ভরসা

নিহত প্রকাশক দীপনের তাঁর স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান জলি বেনারকে বলেন, “বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার হওয়া জরুরি ছিল। জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে এই রায়। তবে লেখক-প্রকাশকদের ভীতি এতে কমবে না।”

“জীবন হারিয়ে গেলে বিচার এবং রায় দিয়ে কী হবে?” প্রশ্ন তোলেন দীপনের জাগৃতি প্রকাশনীর বর্তমান কর্ণধার। 

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের রায়ের পর একই হামলায় আহত তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, “আমরা আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সরকার আরো স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে। বাকস্বাধীনতা আরো সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।” 

কবি টোকন বলেন, “দুটি বিচারের পর পরই লেখক মুশতাক আহমেদ কারাগারে মারা গেলেন, কার্টুনিস্ট কিশোর জেলে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন। তাহলে এসব বিচার করে কী হবে?” 

শ্রাবণ প্রকাশনীর রবীন বলেন, “যে দেশে লেখার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে জামিন মেলে না, লেখককে জেলে পচে মরতে হয়, সেখানে এমন বিচারে সমাজের কিছু যায় বা আসে না।” 

মুশতাকের মৃত্যু: সন্দেহ-প্রতিবাদ

“ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জেলে থাকা অবস্থায় মুশতাক ভাইয়ের এমন মৃত্যু নিয়ে আমার সন্দেহ থেকে যাবে,” বলেন টোকন। রবীনের ভাষ্য, “তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে কিনা সেটা কিন্তু আমরা নিশ্চিত না। তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে কিনা তারও তদন্ত হওয়া দরকার।” 

আওয়ামী লীগ নেতা হানিফও বলেন, “কারাগারে বিচারাধীন কোনো ব্যক্তির মৃত্যু অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত নয়। আমরাও মনে করি, এর তদন্ত হওয়া উচিত।” 

মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে শুক্রবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এস এম তরিকুল ইসলাম।

কমিটি আগামী দুই কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে বলেও জানান তিনি। 

এদিকে কারাবন্দি অবস্থায় লেখক মুশতাক আহমেদকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে শুক্রবার এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন