প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের মানহানির অভিযোগ, আইনজীবী কারাগারে

আহম্মদ ফয়েজ
2022.03.04
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের মানহানির অভিযোগ, আইনজীবী কারাগারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নাগরিকদের সমাবেশ। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১।
[বেনারনিউজ]

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা ও এক সাংসদকে নিয়ে ‘মানহানিকর’ ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার আইনজীবীকে শুক্রবার জেলে পাঠিয়েছে ফরিদপুরের আদালত।

তথ্যটি বেনারকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফরিদপুরের সিনিয়র আইনজীবী মো: আব্দুল মান্নান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকার সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনকে নিয়ে “একটি মানহানিকর ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করায় স্থানীয় মেহেদী পারভেজ নামে এক ব্যক্তি থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন,” জানিয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম রেজা বেনারকে বলেন, এর প্রেক্ষিতেই বৃহস্পতিবার আইনজীবী শাহ নেওয়াজ হাসানকে (৩৬) গ্রেপ্তার করা হয়।

“ওই ভিডিওটি ফেসবুক থেকে মুছে দেয়া হলেও এই ঘটনাটি আইনে গুরুতর অপরাধ,” জানান ওসি সেলিম। তিনি বলেন, “আসামিকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আমরা তাঁর মোবাইল জব্দ করেছি। মোবাইল ফরেনসিক করা হলেই এটা জানা যাবে কখন ওই ভিডিও তিনি মুছে দিয়েছেন।”

এই মামলায় অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে এবং কী কারণে ওই আইনজীবী এমন ভিডিও শেয়ার করেছেন তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান ওসি।

একটি কার্টুন ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী, তাঁর বোন শেখ রেহানা ও ফরিদপুর-৪ আসনের সাংসদ নিক্সনকে নিয়ে “আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যসহ একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়,” বলে বেনারকে জানান মামলার বাদী মেহেদী।

নিজেকে সংসদ সদস্যের সমর্থক দাবি করে মেহেদী বলেন, “বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিয়ে এমন মানহানিকর পোষ্ট আমাকে ব্যথিত করেছে বলেই মামলাটি দায়ের করেছি।”

তবে আইনজীবী হাসান ভিডিও শেয়ার করেছেন কিনা এবং সেটি তাঁর কাছে আছে কিনা জানতে চাইল মেহেদী ফোন কেটে দেন।

মজিবুর রহমান নিক্সন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। গত নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত মজিবুর স্বতন্ত্র সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

গ্রেপ্তার আইনজীবী হাসানের বাবা আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা বেনারকে বলেন, “আমি ছাত্র জীবনে ভাঙ্গা কলেজে (সরকারি কে.এম কলেজ) ছাত্রলীগ থেকে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলাম। থানা ছাত্রলীগেরও সভাপতি ছিলাম। আমরা আওয়ামী পরিবার, আমার ছেলে এমন কোনো কাজ করার কথা না, যা বঙ্গবন্ধু পরিবারের মানহানি ঘটায়।”

আইনজীবীদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন জানিয়ে রাজ্জাক বলেন, “আমি বুঝতে পারছি না, আমার ছেলে স্থানীয় রাজনীতির কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার কিনা।”

প্রধানমন্ত্রীর বিকৃত ছবি শেয়ার করে গ্রেপ্তার

গত মঙ্গলবার সকালে মাগুরার শালিখা উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে পোস্ট করার অভিযোগে মাহবুব শিকদার (৫০) নামের স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ভাইকে গ্রেপ্তারের পর জেলে পাঠায় পুলিশ।

নিজের ভাই রাজনীতির সাথে যুক্ত নয় দাবি করে শালিখা উপজেলা বিএনপির সদস্য ও শালিখা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুসাইন শিকদার সাংবাদিকদের বলেন, “আমার ভাই দেড় মাস আগে ফেসবুক খুলেছে। কীভাবে তার অ্যাকাউন্টে এমন ছবি এলো তা আমাদের জানা নেই।”

শালিখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিশারুল ইসলাম জানান, শালিখা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. বাবুল হোসেন বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

“আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন,” যোগ করেন ওসি।

সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নয়, মামলা করছে অন্য কেউ

দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলাগুলোর ওপর নজর রাখে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)।

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই আইনে করা মোট ৮৩৫টি মামলার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করেছে সিজিএস।

“এসব মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন দুই হাজার ২২ জন এবং তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭০৭ জন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সংখ্যা বিবেচনায় সর্বোচ্চ রয়েছেন রাজনীতিবিদ, এরপর সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী,” বেনারকে বলেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

তিনি বলেন, “বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মানহানি করার অভিযোগে এই সময়ে ৯৫টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে দলীয় সমর্থকেরা করেছেন ৮২টি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করেছে ১৩টি।”

“মন্ত্রীদের মানহানির জন্য ৫০টি মামলা করা হয়েছে। যার মধ্যে মাত্র চারটি করেছেন ভুক্তভোগীরা, বাকিগুলো করেছেন দলীয় সমর্থকেরা,” বলেন জিল্লুর।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই আইনে বলা আছে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মামলা করতে পারবেন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে মামলাগুলো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নয়, অন্য কেউ করছেন, এটা আইনের ব্যত্যয়।”

আইনটির ভয়াবহ অপপ্রয়োগ হচ্ছে উল্লেখ করে জিল্লুর বলেন, “দ্রুত আইনটি বাতিল বা সংস্কার করা প্রয়োজন।”

উল্লেখ্য, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত কয়েকমাস ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলে আসছেন, কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অসঙ্গতি থাকলে সরকার আইনটি সংশোধন করবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এ লক্ষ্যে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে আইন মন্ত্রণালয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন