গ্রাম ও শহরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন: বিশ্বব্যাংক

পুলক ঘটক
ঢাকা
2021-09-16
Share
গ্রাম ও শহরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন: বিশ্বব্যাংক ঢাকার মিরপুর ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিশু আসমা আক্তার। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি আটজন দরিদ্র মানুষের মধ্যে একজন শিশু। ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
[সাবরিনা ইয়সামীন/বেনারনিউজ]

শহরের দরিদ্র মানুষের সহায়তায় আরও বেশি মনোযোগী হতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শহরের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন দরিদ্র, যাদের বড়ো অংশ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন।

এ ছাড়াও শহরের অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে বিশ্ব্যব্যাংকের “বাংলাদেশ সোশ্যাল প্রটেকশন পাবলিক এক্সপেনডিচার রিভিউ” শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, শহর এলাকায় প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ সামাজিক সুরক্ষায় আছেন, যদিও সেখানকার ১৯ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে ২৬ শতাংশ মানুষ দরিদ্র, যদিও ৩৬ শতাংশ মানুষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রয়েছেন। 

গ্রাম ও শহর এলাকার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন—এমন মত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “সরকারের যেসব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে, তার প্রায় সবই গ্রামাঞ্চলে। শহরের হকার, ঠেলাগাড়ি চালক, ভিক্ষাজীবী—এসব শ্রেণির মানুষের জন্য তেমন কোনো কর্মসূচি নেই। এনজিওগুলোও কাজ করছে গ্রামে। সুতরাং এখন শহরাঞ্চলে বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দিকে নজর দেওয়া দরকার।”

তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ। 

বেনারকে তিনি বলেছেন, “দুটোই লাগবে, কারণ দারিদ্র গ্রামেও থাকে, শহরেও থাকে। তবে গ্রামে প্রাধান্য দিতে হবে। শহরের সমস্যা একরকম, গ্রামের অন্যরকম। গ্রামে দরিদ্ররা সংকটের সময় পরিবারের অন্যদের বা প্রতিবেশীর সহযোগিতা পায়। কিন্তু শহরের পরিবারগুলো বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দারিদ্রের কষ্ট বেশি হয়।” 

“আবার শহরে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে জোর দিলে লোকজন শহরে বেশি আসবে। তাতে সমস্যা বাড়তে পারে,” মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

এই শহরমুখী প্রবণতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিষয়ে জানতে চাইলে ড. আজিজ বলেন, “সেটা খুব বেশি হবে না। কারণ শহরে বাড়ি ভাড়া, ইউটিলিটি বিল সবকিছুই বেশি। কাজের প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি মানুষ শহরমুখী হবে বলে মনে হয় না।” 

ড. সালেহউদ্দিন বলেছেন, “দেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অনেকরকম এবং এগুলোর বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষও বিভিন্ন। ফলে এই কর্মসূচিগুলোতে সমন্বয়হীনতা আছে। ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা আছে। যাদের জন্য সহায়তা প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে তারা না পেয়ে তুলনামূলকভাবে সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী সুবিধা নেয়। এই সমস্যাগুলো দূর করা প্রয়োজন।” 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী, তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.৫ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে অনুমিত হিসাবে তা নেমে আসে ২০.৫ শতাংশে। এর পর দারিদ্র্যের হার নিয়ে আর কোনো নতুন তথ্য প্রকাশ করেনি বিবিএস। 

কী বলছে বিশ্বব্যাংক?

বাংলাদেশের চলমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং সেগুলোকে কীভাবে আরও গতিশীল করা যায় সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন কর্মকৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এর মাধ্যমে দরিদ্র মানুষ উপকৃত হচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণে মানোন্নয়ন ঘটালে বাংলাদেশে দারিদ্র্য আরও কমবে।

“সুরক্ষা কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা যথাযথভাবে গ্রহণ করা হলে এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৩৬ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব,” বলেছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। তবে শহুরে জনসংখ্যার ৫ জনের ১ জন দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে এবং শহরের অর্ধেক পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

একটি স্বচ্ছ জরিপ করে “ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেস” তৈরির মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগীর তালিকা করতে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদনটিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অব্যাহত বিনিয়োগ এবং প্রকল্প পরিকল্পনা, নকশা ও বিভিন্ন কর্মসূচির ভাতা বিতরণসহ বিদ্যমান কাঠামো কীভাবে উন্নত করা যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার দনদন চেন বলেন, “গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি অনেক বাড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রতি ১০ ঘরের তিন ঘর এই পরিধির আওতায় রয়েছে।”

চলমান বৈশ্বিক করোনা মহামারির কারণে আরও জোরালো কর্মসূচির প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যথাযথ লক্ষ্য ঠিক করে এই কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশটিতে দারিদ্র্যের হার কমবে।”

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৬ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা বা সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় হয়েছে; যা এই ধরনের আয়ের দেশগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে, কিছু ঝুঁকি-গোষ্ঠী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কর্মসূচিগুলোতে দরিদ্র তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “প্রতি আট জন দরিদ্র ব্যক্তির মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। এরপরও, দরিদ্র শিশুরা সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ পায়। এই ব্যয় আরো কার্যকর হবে, যদি বরাদ্দগুলো বিভিন্ন স্তরের দরিদ্রদের মাঝে অনুপাত অনুযায়ী ভাগ করে দেয়া যায় এবং সেভাবেই কর্মসূচিগুলো হাতে নিতে হবে।”

বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালাইন কদুয়েল বলেন, “শৈশবে বিনিয়োগ একটি শিশুকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে আরো উৎপাদনশীল হতে সাহায্য করে। এভাবে প্রজন্ম ধরে দারিদ্র্যের চক্র ভেঙে দেয়া সম্ভব। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কর্মসূচি নিতে হবে।”

সুবিধাভোগীরা যাতে সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দ্রুত পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিতের পরামর্শ রয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, সরকারের কাছ থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পৌঁছানোর ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও দ্রুততার সঙ্গে করার জন্য মোবাইল আর্থিক সেবা বাড়াতে হবে। সরকারের কোষাগার থেকে তহবিল সুবিধাভোগীর কাছে স্থানান্তরে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। কিন্তু মোবাইলে সেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থা হলে এটি ১০ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন