পরিবেশবাদীদের ভাবিয়ে তুলেছে ইরাবতী ডলফিনের ঘন ঘন মৃত্যু

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.05.27
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
পরিবেশবাদীদের ভাবিয়ে তুলেছে ইরাবতী ডলফিনের ঘন ঘন মৃত্যু কম্বোডিয়ার ক্রেতি প্রদেশের নদীতে একটি ইরাবতী ডলফিন। ২৫ মার্চ ২০০৭।
[রয়টার্স]

কুয়াকাটা সৈকতে ঘন ঘন মিলছে মৃত ডলফিনের মৃতদেহ। চলতি বছরেই কুয়াকাটা সৈকতে পাওয়া গেছে কমপক্ষে আটটি মৃত ডলফিন।

শৈশব থেকেই সাগর ও নদীতে ডলফিন দেখে আসছেন কুয়াকাটা এলাকার মৎস্যজীবী নুরু মাঝি (৫৮)। স্থানীয়দের কাছে শুশুক নামে পরিচিত ইরাবতী ডলফিনের ঝাঁক তাঁকে এখনও স্মৃতিকাতর করে তোলে।

এখন উপকূলে ও নদীতে আর আগের মতো ডলফিনের দেখা যায় না। বরং দেখা যায় সৈকতে পড়ে আছে ইরাবতী ডলফিনের মৃতদেহ।

“আগে দেখতাম ঝাঁকে ঝাঁকে শুশুক ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখনও দেখা যায়; তবে সংখ্যায় অনেক কম। কিছুদিন পর পর মরা শুশুক দেখা যায়। একেকটি মৃত শুশুক দেখলে মনটা খারাপ হয়” আক্ষেপের সুরে বেনারকে বলেন নুরু মাঝি।

“শুশুক মাছের জালে আটকে গেলে পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের মধ‌্যে মারা যায়,” জানিয়ে তিনি বলেন, “কোনো জেলে ইচ্ছা করে শুশুক মারে না। এমন ঘটনায় আমরা খুবই কষ্ট পাই।”

নুরু মাঝি বলেন, ডলফিন দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। কোনো একটি ডলফিন জালে আটকা পড়লে অন্যরা সেটির আশপাশে ঘুরতে থাকে।”

সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ডলফিন মৃত্যুর ব্যাপারে তিনি বলেন, “আগে মাঝির সংখ্যা কম ছিল। জালও ছিল কম। এ ছাড়া সূতার জাল ছিল।”

“কিন্তু এখন জেলের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ হয়েছে। জেলেরা বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম নাইলনের জাল ব্যবহার করে। এ ধরনের জালে আটকা পড়লে ডলফিন মারা যায়,” যোগ করেন তিনি।

শুধু নুরু মাঝি নন। সরকার, পরিবেশবাদী, গবেষক সকলেই ঘন ঘন ইরাবতী ডলফিনের মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশেই বেশি বাস, ‘রক্ষা করা জরুরি’

বিশ্বে “অন্যতম সংকটাপন্ন” এবং বাংলাদেশে সংকটাপন্ন ইরাবতী ডলফিনের সবচেয়ে বড়ো আবাসস্থল বাংলাদেশের উপকূল ও আশপাশের নদ-নদী।

বিশ্বে যে প্রায় সাত হাজার ইরাবতী ডলফিন অবশিষ্ট রয়েছে, তার মধ‌্যে প্রায় ছয় হাজারই রয়েছে বাংলাদেশে। তবে গত কয়েক বছর ধরে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলে ঘন ঘন মিলছে এই প্রজাতির ডলফিনের মৃতদেহ।

মিয়ানমারের ইরাবতী নদীর নামেই এই ডলফিনটির নাম। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিঠাপানি ও লোনাপানির এলাকায় এদের বিচরণ। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ফিলিপাইন পর্যন্ত এদের বসবাস।

ইরাবতী ডলফিনের মাথা গোলাকার ধরনের, ঠোঁট নেই।

এ বছর জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে কমপক্ষে আটটি ইরাবতী ডলফিনের মৃতদেহ উদ্ধার করার তথ্য বেনারকে জানান পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এছাড়া কুয়াকাটায় ২০২১ সালে ২৪টি, ২০২০ সালে ১৮টি এবং ২০১৯ সালে ১২টি ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া যায় বলে বেনারকে জানান কুয়াকাটার ডলফিন রক্ষা কমিটির প্রধান রুমান ইমতিয়াজ তুষার।

“প্রতিটি ডলফিনের মৃত্যু সত্যিই খুব কষ্টকর। ডলফিন আমাদের পরিবেশের অন্যতম অংশ এবং ডলফিনের উপস্থিতি ভালো জলজ পরিবেশের নির্দেশক,” বেনারকে বলেন বন কর্মকর্তা মামুন।

dolphin2.jpg
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসা একটি মৃত্যু ইরাবতী ডলফিন। ১৪ মে ২০২২। [সৌজন্যে: কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটি]

বিশ্বে যতসংখ‌্যক ইরাবতী ডলফিন রয়েছে, তার শতকরা ৮০ ভাগ বাংলাদেশে রয়েছে জানিয়ে ডলফিন অ‌্যাকশন প্ল‌্যান তৈরির সাথে যুক্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিজ বেনারকে বলেন, “এগুলো রক্ষা করা জরুরি।”

তিনি বলেন, “কিছু কিছু জেলে খুব পাতলা স্বচ্ছ জাল ব্যবহার করে। এগুলোর অস্তিত্ব ডলফিন বুঝতে পারে না। যখন তারা মাছ ধরতে তাড়া করে তখন ওই সূক্ষ্ম জালে আটকা পড়ে এবং এক পর্যায়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায়।”

বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে মূলত ১০ ধরনের ডলফিন ও তিমি দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিন।

ডলফিন স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং চোখে ভালোভাবে দেখতে পায় না। বাদুড়ের মতো শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে পানিতে চলাচল করে, মাছ শিকার করে।

মাছের মতো পানি থেকে অক্সিজেন নিয়ে বাঁচতে পারে না ডলফিন। সে কারণে তারা কিছুক্ষণ পর পর পানির উপরিভাগে উঠে অক্সিজেন গ্রহণ করে। আবার পানিতে চলে যায়। বাতাস থেকে অক্সিজেন নিতে না পারলে মৃত্যুবরণ করে।

dolphin3.jpg
কম্বোডিয়ার ক্রেতি প্রদেশে মেকং নদীতে মাছ ধরার জন্য জাল ফেলছেন এক জেলে। মেকং নদী ইরাবতী ডলফিনের অন্যতম আবাসস্থল। ২৪ মার্চ ২০০৭। [রয়টার্স]

জাল বেশি তাই ডলফিন মরেও বেশি

ইরাবতী ডলফিনের চলাচল মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ার উপকূল।

গাঙ্গেয় ও ইরাবতী ডলফিন স্বাদু পানি ও নোনা পানির ওপর নির্ভর করে। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবনের নদ-নদী ইরাবতী ডলফিনের অন্যতম অভয়ারণ্য। সেখানে কমপক্ষে ৪৫১টি ইরাবতী ডলফিন রয়েছে বলে বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জরিপে বেরিয়ে এসেছে।

সুন্দরবন ছাড়াও বৃহত্তর বরিশাল উপকূল ও নোয়াখালীর নিঝুমদ্বীপেও ইরাবতী ডলফিনের উপস্থিতি রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন সোসাইটির হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ছয় হাজার ইরাবতী ডলফিন রয়েছে। আবার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন ও নেচার (আইইউসিএন) এর হিসাবে বাংলাদেশে ইরাবতী ডলফিনের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৮০০।

বাংলাদেশে ডলফিন সংরক্ষণের জন্য ২০১৯ সালে বনবিভাগ ডলফিন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেই কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালের মধ‌্যে মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে ডলফিন রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মৎস্য বিভাগকে।

মৎস্য বিভাগের মেরিন ফিসারিজ সার্ভে ম্যানেজমেন্ট এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফ উদ্দিন বেনারকে বলেন, কুয়াকাটা অঞ্চলে মাছ বেশি। এ কারণে সেখানে জেলের সংখ্যাও বেশি।

তিনি বলেন, “জেলে বেশি হওয়ায় ওই অঞ্চলে জালের সংখ্যাও বেশি। ফলে জেলেদের জালে আটকা পড়ে ঘন ঘন ডলফিন মারা যাচ্ছে।”

ড. শরীফ বলেন, ডলফিন অ‌্যাকশন প্ল‌্যান অনুযায়ী, “ডলফিন রক্ষার জন্য মৎস্যজীবীদের সাথে নিয়ে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছি। জেলেরা বুঝতে পারলে অতি দ্রুত যাতে আটকে পড়া ডলফিন জাল থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সেজন্য তাদের বোঝানো হচ্ছে।”

তবে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, আটকা পড়া ডলফিনকে জাল থেকে ছাড়িয়ে বাঁচানো খুব কঠিন। কারণ ডলফিন সর্বোচ্চ ১০ মিনিট পর্যন্ত একনাগাড়ে পানির নিচে থাকতে পারে।

কুয়াকাটার ডলফিন রক্ষা কমিটির প্রধান তুষার বেনারকে বলেন, “ডলফিনের মৃত্যু নিয়ে সবাই একটি কথাই বলে থাকেন, মাছের জালে আটকা পড়ে মারা যায়। কিন্তু আমার প্রশ্ন জেলে তো সারা বাংলাদেশে রয়েছে। সেখানে মারা যাচ্ছে না কেন? আবার অনেক ডলফিনের গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।”

তুষার বলেন, “আমার মনে হয়, কুয়াকাটা অঞ্চলেই কেন এত সংখ্যক ডলফিনের মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে সেব্যাপারে সরকারের উচিত নতুন করে গবেষণা করা।”

বিজ্ঞানীদের মতে, জেলেদের জালে আটকা পড়া ছাড়াও, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর দূষণ ডলফিনের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তন ও উজান থেকে পানি প্রত্যাহারের কারণে স্বাদু পানির সরবরাহ কমে আসছে। এই কারণেও ডলফিন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ব্যাংকক থেকে সুবেল রায় ভাণ্ডারী।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।