মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিবেদন: বাংলাদেশে সংবাদকর্মীরা গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যার শিকার

আহম্মদ ফয়েজ
ঢাকা
2021-05-06
Share
মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিবেদন: বাংলাদেশে সংবাদকর্মীরা গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হত্যার শিকার নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই মাস পর বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে যশোরের আদালতে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ৩ মে ২০২০।
[বেনারনিউজ]

সাংবাদিকদের জবাই করার আহবান জানিয়ে একজন ইসলামী বক্তার একটি ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় ভিন্নমতের মানুষদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আরো সংকুচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) প্রকাশিত সাউথ এশিয়া প্রেস ফ্রিডম প্রতিবেদনে (২০২০-২১) বলা হয়, ওয়াসেক বিল্লাহ নোমানীর ভাইরাল হওয়া ওই চার মিনিটের ভিডিওটিতে তিনি বলছেন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার পর সাংবাদিকদের জবাই করা হবে। তিনি কয়েক হাজার মানুষের সামনে এই কথাটি বার বার বলছিলেন।

তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের আমলেও উগ্র সুন্নি মতাবলম্বীদের তৎপরতা দেশের গণমাধ্যমের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে মনে করে আইএফজে।

হেফাজত ইসলামের এই নেতার এমন ঘৃণা ছড়ানো আরো অনেক বক্তব্য ফেসবুক ও ইউটিউবে পাওয়া যায়, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের বিরুদ্ধেও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়।

ওয়াজে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ পুলিশ নোমানীকে গত ১১ এপ্রিল ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার করেছে। নোমানী একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক। 

গত এক দশক ধরে বাংলাদেশে এই অবস্থা বিরাজ করছে—এমনটি দাবি করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে উগ্রপন্থী হেফাজতে ইসলাম নাস্তিকদের ফাঁসি দাবি করে ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে জমায়েত করে। এর পরবর্তী চার বছরে প্রায় ১০জন মুক্তমনা লেখক, আন্দোলনকর্মী এবং চিন্তককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। 

সাংবাদিকদের ওপর ক্র্যাকডাউন

গত বছর করোনাভাইরাস মহামারি অজুহাত হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের সমালোচকদের ওপর ব্যাপক ক্র্যাকডাউন চালানোর সুযোগ দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় এই প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, ওই সময়কালে হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন এবং তিন সাংবাদিকের হত্যার ঘটনা দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের জন্য একটি ভয়ার্ত অবস্থার সৃষ্টি করেছে।

এতে বলা হয়, “ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাগারে থাকা অবস্থায় একজন লেখকের মৃত্যুর পর এই কঠোর আইনটি সামান্য লঙ্ঘনের খেসারত কত কঠিনভাবে দিতে হয়, তা প্রকাশ্যে আসে। এটি অনলাইনে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি।”

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানহানির সঙ্গে সম্পৃক্ত আইনগুলোর প্রয়োগও ব্যাপকভাবে করা হয়েছে।

গত ২৯ মার্চ তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, দেশে এক হাজার ২২৭টি সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা এক কোটি এবং সংবাদপত্রগুলো “যে পর্যায়ে স্বাধীনতা ভোগ করছে তা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি।”

তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশে সাংবাদিকতার প্রকৃত চিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। 

হয়রানি ও হত্যা

প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হয়, এপ্রিল ২০২০ থেকে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত দেশে ২২৫টি সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন, জুলহাস উদ্দীন এবং বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির খুন হয়েছেন। 

“লেখক মুশতাক আহমেদ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক থাকা অবস্থায় কারাগারে মারা গেছেন ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সরকারের পক্ষ থেকে কোভিড-১৯ মোকাবেলা নিয়ে ফেসবুকে সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছেন।”

নিরাপত্তা হেফাজতে এই লেখকের মৃত্যুকে তাঁর পরিবার রহস্যজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

“সুখবর বলতে এখানে একটিই। গত ২৯ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ হওয়া সাংবাদিক গোলাম সারওয়ারকে ১ নভেম্বর উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর গায়ে ব্যাপক নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়, তবে তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান,” প্রতিবেদনে বলা হয়। 

মহামারিকালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা

প্রতিবেদনে বলা হয় মহামারি চলাকালে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপক প্রয়োগ ঘটেছে এবং এর মাধ্যমে বিরুদ্ধ মতের টুটি চেপে ধরা হয়েছে।

২০১৩ সালে ঢাকায় স্থাপিত দেশের একমাত্র সাইবার ক্রাইম ট্রাইবুনালে তিন হাজার ৩২৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যেগুলোর বেশিরভাগই দায়ের করা হয়েছে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য।

গত বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘের একটি ফাঁস হওয়া নথির ভিত্তিতে, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে ২০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে এমন একটি সংবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিতে রেডিও ফ্রি এশিয়ার সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেনারনিউজ ব্লক করে দেয় বাংলাদেশ সরকার। 

২০২০ সালের মে মাসের প্রথম সাত দিনেই আটজন সাংবাদিক এবং লেখককে ফেসবুকে লেখালেখির জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। 

কোনো কিছু লিখতে ভয় লাগে: কাজল

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি সংবাদের লিঙ্ক শেয়ার করার পর গত বছর ১০ মার্চ নিখোঁজ হন ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। ৫৩ দিন পরে ৩ মে তাঁকে খুঁজে পায় পুলিশ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। 

গত বছর ২৫ ডিসেম্বর জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন কাজল।

কাজল বেনারকে বলেন, জেল থেকে মুক্ত হলেও তিনি এখনও স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করতে পারেননি। 

“আমি যে ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে আমার পক্ষে কোনো কাজে মন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কিছু করতে বা লিখতে ভয় লাগে।” 

তিনি বলেন, তাঁর কাছে এই জীবনকে নতুন জীবন মনে হলেও তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে খুবই চিন্তিত। 

received_302466524839948.jpeg
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর-বিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের সাথে হেফাজত কর্মীদের সংঘর্ষের ছবি তুলতে গেলে দলটির কর্মীদের মারধরে আহত ফটোসাংবাদিক হারুনুর রশীদ রুবেলকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সহকর্মীরা। ২ এপ্রিল ২০২১। [বেনারনিউজ]

নতুন বিপদ উগ্র মতাবলম্বীরা

প্রতিবেদনে বলা হয়, উগ্র সুন্নি মতাবলম্বীদের তৎপরতা দেশের গণমাধ্যমের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গত ৬ এপ্রিল রাতে হেফাজত ইসলামের কর্মীরা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকায় এসএ টিভির স্থানীয় প্রতিনিধি হাবিবুর রহমানকে তাঁর বাড়ি থেকে বের করে এনে নির্যাতন চালায়। হাবিবুরের অপরাধ তিনি হেফাজতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মামুনুল হকের কাছে ক্ষমা চাননি। মামুনুল একটি রিসোর্টে একজন নারীসহ আটক হওয়ার খবর প্রচার করেছিলেন তিনি।

২৮ মার্চ হেফাজত কর্মীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে ২৮ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে কমপক্ষে ১৩জন সাংবাদিক হেফাজত কর্মীদের হামলায় আহত হন।

কয়েকশ হেফাজত কর্মী সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা এলাকায় হিন্দুদের বাড়ি–ঘরে হামলা ও লুটপাট করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি

সম্প্রতি মূলধারার গণমাধ্যমে অনেক সংবাদ প্রকাশ করতে না পেরে সাংবাদিকরা বিকল্প হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা নানারকম সেন্সরশিপ মোকাবেলা করছেন।

এসবের মধ্যে রয়েছে গ্রেপ্তার, লেখা অথবা পেইজ রিমুভ করে দেয়া এবং রাষ্ট্রীয় অথবা অন্য কোনো পক্ষের হয়রানি।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম ধর্ম নিয়ে সমালোচনামূলক কোনো সংবাদের সাহস রাখে না। সম্প্রতি আহমদিয়া মুসলিম জামাত নামে একটি সংখ্যালঘু মুসলিম গ্রুপের ওপর হামলার হলেও বেশিরভাগ গণমাধ্যমে সেই সংবাদ দেখা যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেসবুক ও ইউটিউব উগ্রবাদীদের মত এবং চিন্তা প্রচারের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত হলেও ভিন্ন মতের অ্যাকাউন্টগুলোকে ‘ডাউন’ করে দেয় এই প্লাটফর্মগুলো।

এই অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে চেয়ে ফেসবুকের বাংলাদেশ বিষয়ক কর্মকর্তা সাবহানাজ রশীদ দিয়াকে ইমেইল পাঠানো হলেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আংশিক একমত তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বেনারকে বলেন, সরকার গণমাধ্যম বা মুক্ত মতের ওপর ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে—এটা মোটেও সত্য নয়। এই সরকার মুক্ত মতে বিশ্বাসী।

“তবে প্রতিবেদনে উগ্র ইসলামবাদীদের নিয়ে যে কথা বলা হয়েছে সেটার সঙ্গে আমি একমত। এই উগ্রবাদীদের নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ।”

“আমি মনে করি এই উগ্রবাদীদের প্রচারণা রোধ শুধুমাত্র প্রযুক্তি দিয়ে করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করছে যাতে করে এটা আইন দিয়ে মোকাবেলা করা যায়,” যোগ করেন মন্ত্রী। 

তিনি আরো বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মূলধারার কোনো গণমাধ্যমকর্মী আক্রান্ত হচ্ছে না।

“যারা বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি করেন তাঁরা ফেসবুকের লেখা ও সাংবাদিকতাকে অনেক সময় গুলিয়ে ফেলেন—এর ফলে তাঁরা বিভ্রান্ত হন এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন,” মনে করেন তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন