জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ

পুলক ঘটক
ঢাকা
2020-12-21
Share
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ ময়মনসিংহে দেশের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করছেন একজন কর্মী। জাতীয় গ্রিডের সাথে যুক্ত হওয়া এই কেন্দ্রটি ২০২১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে দেশের মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে। ২১ ডিসেম্বর ২০২০।
[বেনারনিউজ]

জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকে দুই ধাপ অগ্রগতির ফলে বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩৩তম এবং দক্ষিণ এশীয় আট দেশের মধ্যে পঞ্চম। 

এ বছর পরিবেশের প্রভাবজনিত সমন্বিত মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এগিয়েছে নয় ধাপ। 

সোমবার সকালে ইউএনডিপি যখন এই প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল ঠিক তখনই দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) অনুযায়ী সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে উঠে আসে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার নাম। 

সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে জনবহুল এই শহরের একিউআই স্কোর ছিল ৩২৩, যাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। একিউইআই মান ৩০০ এর বেশি হলে মানুষকে বাইরের সব কাজ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়। কারণ এ অবস্থায় প্রত্যেকেই মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে পারেন। 

সোমবার ঢাকার এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২০ প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম। 

ইউএনডিপি’র প্রতিবেদনের সঙ্গে ঢাকার বায়ুদূষণ সংক্রান্ত একিইউ প্রতিবেদনের বৈপরীত্য সম্পর্কে তাঁর কাছে জানতে চাইলে ড. শামসুল বেনারকে বলেন, “ইউএনডিপির সূচকে অনেক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশের কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা প্রাসঙ্গিক হলেও সেটা এক বছরের সামগ্রিক মূল্যায়ন। আর একিউইআই প্রতিবেদন হলো একটি রিয়াল টাইম প্রতিবেদন, যা প্রতি মুহূর্তে ওঠানামা করে।” 

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব উন্নয়ন সূচকের মাধ্যমে মূলত একটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার সামগ্রিক অবস্থা পরিমাপ করা হয়। তবে এবার দুটি বিষয় নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। তা হলো কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের মাত্রা ও মোট ব্যবহৃত সম্পদের পরিমাণ। 

এ বছর ৫০টিরও বেশি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অধিক নির্ভরশীলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে রাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান থেকে ছিটকে পড়েছে বলেও জানানো হয় প্রতিবেদনে। 

মানব উন্নয়নে বাংলাদেশ

ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে মানব উন্নয়ন সূচকে শতকরা ৬০ দশমিক ৪ ভাগ অগ্রগতি হয়েছে।”

“সার্বিকভাবে মোটাদাগে আমরা ভালো করেছি,” মন্তব্য করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, “তবে আরও উন্নয়ন করার সুযোগ আছে।” 

মন্ত্রী বলেন, “আমাদের সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। তারপরও বাংলাদেশ নানা দুর্যোগের মধ্যে পড়ছে।” 

অনুষ্ঠানে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারিতে এখন পর্যন্ত ৭ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন, তবে “মহামারিজনিত সামগ্রিক প্রভাব আরও অনেক বিস্তৃত ও প্রকট।”

“বহু পরিবার জীবিকা হারিয়ে দারিদ্র সীমানার নিচে নেমে গেছে, আয় অসমতা বেড়েছে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বেড়েছে এবং লেখাপড়া থেকে দীর্ঘ বিরতির কারণে ছাত্রছাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে,” বলেন সুদীপ্ত মুখার্জি। 

ক্রমাগত অগ্রগতি

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মানব উন্নয়ন সূচকে গত কয়েক বছর ধরে দুই থেকে তিন ধাপ করে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে ১৩৯ তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। গত বছর এক ধাপ এবং তার আগের বছর তিন ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।

১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু বেড়েছে ১৪.৪ বছর, গড় শিক্ষাকাল বেড়েছে ৩.৪ বছর। এ ছাড়া এসময়ে মাথাপিছু আয়ের পরিমাণও বেড়েছে প্রায় শতকরা ২২০ দশমিক ১ ভাগ। 

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ভুটান। ভারত দুই ধাপ পিছিয়ে ১৩১তম ও ভুটান পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১২৯তম অবস্থানে উঠে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে পাকিস্তান, নেপাল ও আফগানিস্তান। 

এবারের মানব উন্নয়ন সূচকে আগের বছরের মতো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে নরওয়ে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে আয়ারল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড। 

WE_01.JPG
ঢাকার দূষিত বাতাসের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ফেরিওয়ালা। ২৮ নভেম্বর ২০২০। [বেনারনিউজ]

বায়ুদূষণ নিয়ে শঙ্কা

বাতাসের গুণগতমানের ক্রমগত বিপর্যয় করোনাভাইরাস থেকে জনগণকে রক্ষায় দেশের চলমান লড়াইয়ের এক বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

“ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রাজশাহীসহ বেশ কয়েকটি শহরের বাতাস উদ্বেগজনক মাত্রায় দূষিত,” জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস বেনারকে বলেন, “ইউএনডিপি’র প্রতিবেদনে যাই থাক, বাতাসকে দূষণমুক্ত করতে সমন্বিত প্রয়াস থাকা দরকার।” 

সোমবার সকালের একিউআই সূচক অনুসারে, ৩২৩ স্কোরের মাধ্যমে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছায় ঢাকা। ২৯৪ স্কোর নিয়ে পাকিস্তানের লাহোর দ্বিতীয় এবং ২৯৩ স্কোর নিয়ে ভারতের কলকাতা ছিল তৃতীয় স্থানে।

প্রতিদিনের বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা একিউআই সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটুকু নির্মল বা দূষিত সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয় এবং তাদের জন্য কোনো ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি না তা জানায়।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন