বাংলাদেশে অন্ধত্ব কমলেও রয়েছে চিকিৎসক স্বল্পতা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2021-08-13
Share
বাংলাদেশে অন্ধত্ব কমলেও রয়েছে চিকিৎসক স্বল্পতা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এক রোগীর চোখ পরীক্ষা করছেন একজন চক্ষু চিকিৎসক। ১১ আগস্ট ২০২১।
[জেসমিন পাপড়ি/বেনারনিউজ]

কালো চশমা পরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের একটি বিছানা ছাড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন চাঁদপুরের মোমেনা খাতুন (৬৫)। চোখের ছানি অপারেশনের পরে ছুটি মিলেছে তাঁর।

“চোখে ছানি নিয়ে দীর্ঘদিন কাটালাম। খুব কম দেখতাম। নিজের সন্তান, নাতি নাতনিদের মুখ দেখতে পেতাম না,” বেনারকে তিনি বলেন।

“তবে ছানি অপারেশনের পরে সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে নতুন করে দুনিয়া দেখছি। মাত্র এক হাজার সাতশ টাকায় আমি চোখের আলো ফিরে পেয়েছি,” বলছিলেন মোমেনা খাতুন। 

মোমেনা খাতুনের মতো শত শত নারী-পুরুষ স্বল্প খরচে চোখে আলো ফিরে পাচ্ছেন। চিকিৎসক সঙ্কটসহ নানা প্রতিবন্ধকতা স্বত্বেও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চক্ষু চিকিৎসা বিস্তৃত করায় অন্ধত্বের হার কমাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। 

চোখের চিকিৎসায় জনবল সংকট থাকলেও গত দুই দশকে দেশে অন্ধত্বের হার অনেক কমে এসেছে বলে বেনারকে জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল আই কেয়ারের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (প্লানিং এন্ড রিসার্চ) ডা. মো. শহীদুল ইসলাম। 

ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ওপর চালানো ২০০০ সালের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী জরিপ অনুযায়ী দেশে তখন অন্ধ ব্যক্তির সংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় লাখ। ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে অন্ধ ব্যক্তির সংখ্যা ৫ লাখ ৩৩ হাজারে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত ২০০০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ কোটি, ২০২০ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১৬ কোটিতে। বিশ বছরের ব্যবধানে জনসংখ্যা বাড়লেও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা।

তবে ২০২০ সালের জরিপের ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলে জানান ডা. শহীদুল।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের ‘সকলের জন্য দৃষ্টি’ প্রস্তাব

গত ২৩ জুলাই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘সকলের জন্য দৃষ্টি: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ ত্বরান্বিত করার পদক্ষেপ’ শীর্ষক দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক প্রথম রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে। 

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা ‘ফ্রেন্ডস অব ভিশন’ এর পক্ষে রেজুলেশনটি উত্থাপন করেন বলে এক বিবৃতিতে জানায় বাংলাদেশ মিশন।

রাষ্ট্রদূত ফাতিমা রেজুলেশনটিকে বিশ্বের সবার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য উৎসর্গ করে ২০৩০ সালের মধ্যে সব জনগণকে চক্ষু স্বাস্থ্যসেবায় পূর্ণ প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বলেন, “নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশের ৯০ শতাংশ মানুষেরই চোখের সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নেই।”

এই রেজুলেশন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ, তাঁদের পরিবার ও সম্প্রদায়ের জীবন ধারায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন রাষ্ট্রদূত ফাতিমা।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম বলছিলেন, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চোখের চিকিৎসা সম্প্রসারণের ফলেই বাংলাদেশ অন্ধত্ব নির্মূলে সফল হচ্ছে। যা ইতিমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে। 

চোখের চিকিৎসা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও “চোখের চিকিৎসায় আমাদের প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং চিকিৎসকের অভাব রয়েছে,” বেনারকে জানান চক্ষু বিশেষজ্ঞ ড. মাফরুহা আফরিন।

তিনি বলেন, “যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে যত উন্নত ডায়াগনোসিস করা যাবে, তত উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। আর চোখের অনেকটাই নির্ভর করে উন্নত যন্ত্রপাতির ওপর। রাজধানীসহ বেশ কিছু শহরে কিছু উন্নত প্রযুক্তি আসলেও তৃণমূলে তা নেই। ফলে অন্ধত্ব একেবারেই নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।”

“এ ছাড়া চোখের সমস্যা নিয়ে সাধারণ মানুষ সচেতন নন। বেশিরভাগ মানুষই শেষ সময়ে চোখের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, যা তাদের অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায়,” বলেন বাংলাদেশ আই হাসপাতালের এই চিকিৎসক।

তবে গত ১০ বছরে চোখের চিকিৎসায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার সরকার বহুলাংশে বাড়িয়েছে বলে জানান ডা. মো. শহীদুল ইসলাম। 

প্রান্তিক পর্যায়েও ছানি অপারেশন হয়

চোখের অন্ধত্বের ৮০ শতাংশ ছানি রোগের কারণে হয় জানিয়ে ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, দেশে ছানি রোগের অপারেশনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই রোগে অন্ধত্ব কমেছে।

বর্তমানে শুধু শহরে নয় প্রান্তিক পর্যায়েও ছানি অপারেশন করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “আগে প্রতি বছরে ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ২৫০ জনের অপারেশন হতো। সেটা বেড়ে এখন আড়াই হাজারে পৌঁছেছে। দেশে চক্ষু সার্জনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে।”

ডা. শহীদুলের মতে, অন্ধত্বের অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। দেশের প্রায় এক কোটির মতো ডায়াবেটিক রোগী রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এদের মধ্যে যারা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আক্রান্ত তাঁদের ২৫-৩০ শতাংশের চোখে রেটিনোপ্যাথি ধরা পড়ে।

চোখের প্রেসারজনিত ও মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় বয়সজনিত কারণেও অন্ধত্ব হয়ে থাকে বলে জানান চিকিৎসকেরা।

এ ছাড়া দেশে শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ায় প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্ম বেড়েছে। এসব শিশুদের রেটিনোপ্যাথি অব প্রিম্যাচুরিটি (আরওপি) নামে একটি চোখের রোগ ধরা পড়ছে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তারা অন্ধত্বের শিকার হতে পারে।

“আশার খবর হলো সরকার অত্যাধুনিক মেশিনের ব্যবস্থা করেছে যার মাধ্যমে শিশুদের চোখের রেটিনার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা সম্ভব। এ ছাড়া দেশে গ্লুকোমা, রেটিনাসহ চোখের নানা ধরনের জটিল রোগের চিকিৎসাও রয়েছে,” বলেন ডা. শহীদুল।

“চোখের যেকোনো চিকিৎসা বাংলাদেশেই সম্ভব,” জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কয়েকবার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনিস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন।” 

ক্ষীণদৃষ্টি বাড়ছে

চিকিৎসকদের মতে, দেশে অন্ধত্ব কমলেও ক্ষীণ দৃষ্টির মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, যাদের দৃষ্টিসীমা তিন মিটারের কম তাঁদের অন্ধ বলা হয়। এর চেয়ে ভালো দেখেন তবে পুরোপুরি দেখতে পারেন না তাদের ক্ষীণ-দৃষ্টি সম্পন্ন বলা হয়।

মাত্র সাড়ে তিন বছরে চোখে চশমা ব্যবহার শুরু করতে হয়েছে সাড়ে চার বছরের মাহাবীর মোহাম্মদ উজানকে। তার মা সিরাজুম মুনিরা বেনারকে বলেন, “হঠাৎ করেই খেয়াল করলাম ও টিভি খুব কাছ থেকে দেখছে। বারবার চোখ রগড়াচ্ছে। তাই দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। ডাক্তার তাকে চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দেন।”

ডা. শহীদুল ইসলাম বলেন, “ডিজিটালাইজেশনের কারণে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্করাও এখন মোবাইল, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস বেশি ব্যবহার করে। তারা ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন হয়ে পড়ছে। তাদের চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে।” 

প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা স্বল্পতা

বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলতে গিয়ে বাম চোখে আঘাত পেয়ে দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছে বাগেরহাটের কচুয়ার ১৪ বছরের কিশোর শাহরান আলী খান।

শাহরানের মা রাফিজা খাতুন বেনারকে বলেন, আঘাত পাওয়ার পরপরই স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু চোখ পুরোপুরি ভালো হয়নি।

“প্রায় ১৫-২০দিন পরে ঢাকা থেকে বাগেরহাটে রোগী দেখতে আসা একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাতে পারি। তিনি বলেন, আঘাত পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা পেলে শাহরানের চোখ ভালো হতে পারত। এখন আর কিছু করার নেই,” বলেন রাফিজা খাতুন। 

তিনি আফসোস করে বলেন, “এখন মনে হয় শুধু গ্রামে থাকার অপরাধেই আমার ছেলেটার চোখের আলো হারাচ্ছে।”

এদিকে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে গ্রামেগঞ্জে বিনামূল্যে চোখের চিকিৎসায় যেসব ক্যাম্প করানো হয়। সেগুলো “দীর্ঘমেয়াদী নয়,” বলে বেনারকে জানান চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মাফরুহা।

এদিকে সারা দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চোখের “অত্যাধুনিক চিকিৎসা” থাকলেও “জেলা পর্যায়ে এখনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ঘাটতি রয়েছে” বলে বেনারকে জানান ন্যাশনাল আই কেয়ারের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শহীদুল। 

তিনি বলেন, “এই ঘাটতি মেটাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমিউনিটি ক্লিনিকের আদলে কমিউনিটি ভিশন সেন্টার চালু করেছেন। সারা দেশে বর্তমানে ৯০টি ভিশন সেন্টার চালু রয়েছে। আরো ৪০টির কাজ চলছে। সারাদেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ভিশন সেন্টার চালুর হবে।” 

দেখে চক্ষু চিকিৎসক সংকটের কথা স্বীকার করে শহীদুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় এক হাজার চারশ চক্ষু বিশেষজ্ঞ রয়েছে। যা রোগীর তুলনায় খুবই অপ্রতুল।” 

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চক্ষু বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে আগ্রহ কম দেখা যায়। এর অন্যতম কারণ হতে পারে পড়াশোনা শেষ করে একটি চেম্বার দিতে গেলে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কিনতে হয়, যা বেশ খরচের।”

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন