দায়িত্বে অবহেলার দায়ে বিমানবন্দরের পাঁচজন বরখাস্ত, একজন প্রত্যাহার

শরীফ খিয়াম
2019.03.04
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
190304_Plane_hijacking_1000.jpg বাংলাদেশ বিমানের দুবাইগামী ময়ূরপঙ্খী উড়োজাহাজটি ছিনতাই চেষ্টার কারণে চট্টগ্রামে জরুরি অবতরণের পর কমান্ডো অভিযানে সন্দেহভাজন অস্ত্রধারী নিহত হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

বিমান ছিনতাই চেষ্টার দিন ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও একজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনায় শনিবার এই আদেশ জারি করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

সংস্থার গণসংযোগ কর্মকর্তা একেএম রেজাউল করিম সোমবার বেনারকে বলেন, “বিমানবাহিনীর এক সার্জেন্টকে প্রত্যাহার করে বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেবিচক’র দুই কর্মচারী ও তিন আনসার সদস্যকে ‘সাময়িক বরখাস্ত’ করা হয়েছে।”

এদিকে বিমান ছিনতাই চেষ্টা ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন সোমবার দাখিলের কথা থাকলেও তা বৃহস্পতিবার দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব।

বেবিচক’র আদেশ অনুযায়ী, ঘটনার সময় কর্তব্যরত এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফোর্সের (এভসেক) সদস্য ‘পোস্ট সুপারভাইজার’ সার্জেন্ট সাযেদুল ইসলামকে ইতিমধ্যে বিমানবাহিনীতে সংযুক্ত করা হয়েছে।

বরখাস্ত হওয়া বেবিচক কর্মীরা হলেন, অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সশস্ত্র নিরাপত্তা প্রহরী ইউনুস হাওলাদার ও হেভি লাগেজ গেটে (উত্তর) স্ক্যানিংয়ের নিরাপত্তা সুপারভাইজার লেহাজ উদ্দিন ভূঁইয়া।

এছাড়া তিন আনসার সদস্য হলেন বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের কেবিন ব্যাগেজ স্ক্যানিং গেটের অপারেটর আলীম হোসেন, বডি সার্চার মাহফুজুর রহমান এবং হেভি লাগেজ গেট উত্তরের বডি সার্চার সাদ্দাম হোসেন।

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হককে চিঠি দিয়ে এ বিষয়টি জানিয়েছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বেবিচক’র এক কর্মকর্তা বেনারকে জানান, ঘটনার দিন অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে দায়িত্বরত মোট ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর গতিবিধি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ হওয়া চিত্র পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আরো জানান, অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আগের চেয়ে জোরদার হয়েছে। আগামীতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটতে পারে তা নিশ্চিত করতে তৎপর হয়েছে বেবিচকসহ প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থা।

অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশকারী যাত্রী পলাশ আহমেদ ওরফে মাবিহি জাহান ওরফে মাহাদী গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে ঢাকা থেকে উড্ডয়নকারী দুবাইগামী বিমানের ফ্লাইট ‘ময়ূরপঙ্খী’ (বিজি-১৪৭) ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন।

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক কমান্ডো অভিযানে নিহত হন পলাশ। অভিযানের আগেই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন বিমানে থাকা যাত্রীরা।

তদন্ত প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার

ঘটনার রাতেই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোকাব্বির হোসেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। প্রতিবেদন জমা দিতে তাদের পাঁচ ‘কর্মদিবস’ সময় দেওয়া হয়।

সে অনুযায়ী সোমবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও রোববার মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল সাংবাদিকদের জানান, কমিটিকে আরও দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছে। তারা বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন দাখিল করবে।

একইদিন একাদশ সংসদের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকেও আলোচনায় আসে বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা।

“কমিটির আগামী বৈঠকে ছিনতাই চেষ্টা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়কে,” বেনারকে বলেন কমিটির সভাপতি র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।

তিনি আরো বলেন, “মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন দেখে তা নিয়ে আলোচনার পর প্রয়োজনীয় সুপারিশ চূড়ান্ত করবে সংসদীয় কমিটি।”

এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে ঘটনার কারণ উদ্‌ঘাটনে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী।

এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

রহস্য উদ্ঘাটনে সময় লাগবে

ঘটনার এক সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও ‘আসল’ রহস্য উদ্‌ঘাটনে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছে পুলিশ।

ছিনতাই চেষ্টার ২৪ ঘণ্টা পর ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বেবিচক’র শাহ আমানত বিমানবন্দরের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় মামলা করেন। পরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়াকে তা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বেনারকে তিনি বলেন, “র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর কমান্ডোদের জব্দ করা আলামতসহ সবকিছুর ‘প্যাকেজিং’ হয়ে গেছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে আজ (সোমবার) বিকেলের মধ্যেই এগুলো সিআইডির (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হবে।”

সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীর সাথে থাকা খেলনা পিস্তল ও বিস্ফোরক সদৃশ বস্তুর পাশাপাশি বিমানে পাওয়া দুটি গুলির খোসাও আলামত হিসেবে ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে।

সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে

বিমানের সব পাইলট, ক্রু, যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ঠিকানা সংগ্রহ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। পলাশের সাবেক দুই স্ত্রী মেঘলা ও চিত্রনায়িকা সিমলার পাশাপাশি তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে তারা।

“পর্যায়ক্রমে তাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে,” বেনারকে বলেন রাজেশ।

পলাশের নাম উল্লেখ করে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই আসামি তার সহযোগী ‘অপরাপর অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহায়তায়’ ওই অপরাধ (বিমান ছিনতাই) সংঘটনের চেষ্টা করেছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।

যদিও ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামিদের ভূমিকার বিষয়ে আর কিছুই বলা হয়নি। ঘটনার বর্ণনায়ও ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী হিসেবে একজন দুষ্কৃতকারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজি-১৪৭ ফ্লাইটটি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ১৫ মিনিট পরই বোমা সদৃশ বস্তু ও অস্ত্র দেখিয়ে বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেন পলাশ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।