চার মাস বন্ধ থাকার পর আবার ‘ক্রসফায়ার,’ কয়েক দিনের ব্যবধানে র‌্যাবের হাতে নিহত ২

আহম্মদ ফয়েজ
2022.04.21
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
চার মাস বন্ধ থাকার পর আবার ‘ক্রসফায়ার,’ কয়েক দিনের ব্যবধানে র‌্যাবের হাতে নিহত ২ ঢাকার আশুলিয়ায় অভিযানের সময় আত্মসমর্পণ করা জঙ্গিদলের এক সদস্যকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন র‍্যাব সদস্যরা। ১৬ জুলাই ২০১৭।
[এএফপি]

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাবেক এবং বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির পর কয়েকমাস ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি তা আবার শুরু হয়েছে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে মানিকগঞ্জ ও কুমিল্লায় র‌্যাবের গুলিতে নিহত হয়েছেন দুই জন।

বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মো. কাউসার (৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন ডাকাত দাবি করে র‌্যাব বলছে, ঘটনার সময় নিজেদের দুই সদস্য আহত হয়েছেন।

“মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে র‍্যাবের গাড়িতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণের ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ একজন সন্ত্রাসীকে সিঙ্গাইর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে,” গণমাধ্যমকে জানান র‌্যাব-৪ এর কমান্ডার মোজাম্মেল হক।

নিহত কাউসার “ডাকাত দলের সদস্য। তাঁর বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৯টি মামলা রয়েছে,” বেনারকে জানান সিঙ্গাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফিকুল ইসলাম।

ময়নাতদন্তের জন্য কাউসারের মরদেহ জেলা সদরের জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

চার মাস পর ফিরে এলো ক্রসফায়ার

র‌্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চার মাস পর গত ১৭ এপ্রিল প্রথমবারের মতো কোনো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এই দিন কুমিল্লায় সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার হত্যা মামলার প্রধান আসামি রাজু র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

ওই দিন মধ্যরাতে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ি সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে বলে বেনারকে জানান র‌্যাব-১১ এর কুমিল্লা কোম্পানি কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন।

তিনি বলেন “সন্ত্রাসী রাজু তাঁর সহযোগীদের নিয়ে গোলাবাড়ি সীমান্তে অবস্থান করছেন গোপন সূত্রে এমন খবর পেয়ে আমাদের একটি টহল টিম ঘটনাস্থলে যায়।”

র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে “সন্ত্রাসীরা গুলি চালাতে শুরু করেন। পরে আত্মরক্ষায় আমাদের টিমও গুলি চালায়। এতে র‌্যাবের একজন সদস্য ও সন্ত্রাসী রাজু গুলিবিদ্ধ হন,” বলেন সাকিব।

তিনি জানান, আহতদের রাত সোয়া ২টার দিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে “চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন।”

মানবাধিকার সংগঠন আইনও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে ১৭ এপ্রিলের আগে দেশে সর্বশেষ ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছিল গত বছরের দশ ডিসেম্বর। ওইদিনই র‌্যাব ও এর বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

চার মাস বন্ধ থাকার পর আবারো বন্দুকযুদ্ধ শুরু হলো কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রে র‌্যাবের ওপর হামলা হলে সেটা মোকাবেলা করতেই র‌্যাব গুলি চালায়।”

“বিভিন্ন অভিযানে আমাদের ওপর হামলা হয়েছে, হামলার প্রেক্ষিতেই আমাদের ২৯জন সদস্য মারা গেছেন এবং এক হাজারের বেশি সদস্য বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন,” বলেন মঈন।

তিনি বলেন, “বিভিন্ন অভিযানে সন্ত্রাসীদের হামলা থাকবেই। এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। মেনে নিয়েই আমাদেরকে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।”

বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে

কুমিল্লায় ক্রসফায়ারে নিহত রাজুর বাবা সাদেক মিয়া বেনারকে বলেন, ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তাঁর ছেলের বিচারের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেনারের সাথে টেলিফোনে আলাপকালে কুমিল্লা থেকে সাদেক মিয়া বলেন, “আমার ছেলে যদি সত্যিই কোনো অপরাধ করে থাকত তবে তাকে বিচারের আওতায় আনতে তো কোনো অসুবিধা ছিল না। সে কি বিচারের অধিকার রাখে না?”

তিনি বলেন, “আদালতে বিচারের মাধ্যমে আমার ছেলের ফাঁসি হলেও মেনে নিতাম। আমার ছেলে নিরপরাধ প্রমাণ হয়ে খালাসও পেতে পারত। কিন্তু তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হলো।”

নিজের ছেলেকে মেধাবী ছাত্র দাবি করে তিনি বলেন, তার ছেলে ষড়যন্ত্রের শিকার।

এই ভয়াবহ অধিকার লঙ্ঘন ‘থামবে না!’

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর কিছুদিন ক্রসফায়ার বন্ধ ছিল। এর আগেও একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা তথাকথিত ক্রসফায়ারে নিহত হবার পর দেশজুড়ে আলোচনা হয়। এর প্রেক্ষিতে তখনো কিছুদিন ক্রসফায়ার বন্ধ ছিল।

“এই ভয়াবহ অধিকার লঙ্ঘন আসলে থামবে না। কোনো কারণে চাপে পড়লে বাহিনীগুলো কিছুটা চুপ থাকে। এরপর তারা আবারো স্বরূপে ফিরে আসে,” বলেন নূর খান।

তিনি আরো বলেন, নতুন করে আবারো ক্রসফায়ার শুরুর পেছনের উদ্দেশ্য দমন-পীড়ন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আসকের তথ্য মতে, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনার পর কয়েক মাস ক্রসফায়ারের ঘটনা খুব একটা ঘটেনি।

আসক জানায়, ২০২০ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলিবিনিময়ে নিহত হয়েছেন ১৮৮ জন। ২০১৯ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৮৮টি। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে মোট ৪৬৬টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া গেছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন