মোদির ঢাকা সফর: আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও অর্জনের সম্ভাবনা কম

কামরান রেজা চৌধুরী ও যাজ্ঞসেনী চক্রবর্তী
ঢাকা ও কলকাতা
2021-03-23
Share
মোদির ঢাকা সফর: আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও অর্জনের সম্ভাবনা কম দিল্লি সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে অভিবাদন জানাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (বামে)। ৫ অক্টোবর ২০১৯।
[এপি]

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে নানা আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও এতে বড়ো কোনো অর্জনের সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন দুই দেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশ্লেষকরা। কারো কারো মতে এই সফর অনেকটা ‘সোশ্যাল ভিজিট’ জাতীয়। 

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আগামী ২৬ মার্চ ঢাকা আসছেন মোদি।

তাঁর দুই দিনের সফরে বাংলাদেশ ও ভারত মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা থাকলেও সেগুলো সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বিস্তারিত জানাতে পারেননি। 

এদিকে বাংলাদেশের কয়েকটি ইসলামি ও বাম রাজনৈতিক সংগঠন নরেন্দ্র মোদির এই সফরের বিরোধিতা করছে৷ 

মঙ্গলবারও মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর মিছিলে সরকারি ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক আল কাদেরি জয়। 

তবে ছাত্রলীগ হামলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের কর্মীরা নরেন্দ্র মোদির কুশপুত্তলিকা দাহ করে তাঁর ছবি পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। 

মোদিকে ‘মুসলিম বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তাঁর আমন্ত্রণ বাতিল করার আহবান জানিয়ে আসছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সোমবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের নেতারা মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করেন। 

তবে “আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি,” বলে মঙ্গলবার জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। 

সফরকালে নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করা ছাড়াও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করবেন জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই সফরে কিছু সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হবে। সেগুলো চূড়ান্ত করতে কাজ করছি আমরা।” 

তবে কতটি সমঝোতা চুক্তি হতে পারে তা এখনো নিশ্চিত নন বলে জানান তিনি। 

সফরে “বাংলাদেশ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন এবং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা বন্ধের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো” নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। 

ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের বিষয়টি মোদির সফরের সময় বাংলাদেশ উত্থাপন করবে কিনা জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি তিনি। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) প্রাক্তন চেয়ারম্যান রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদের মতে, “ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন সম্পর্কে বাংলাদেশ তার উদ্বেগ উত্থাপন করেছে এবং এ বিষয়ে আলোচনা না করে ভারতের প্রতিশ্রুতির ওপর আমাদের আস্থা রাখতে হবে।” 

সম্ভাবনা নেই তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির

ভারতের শীর্ষ নেতার সফরের সময় “দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমস্যা ও অগ্রগতি,” নিয়ে আলোচনা হলেও “তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে খুব কম অগ্রগতি হবে,” বলে মনে করেন মুন্সী ফয়েজ আহমদ। 

“যা হতে পারে তা হলো, অন্যান্য সাধারণ নদী যেমন ধরলা, মনুসহ ছয়টি নদীর পানি বণ্টনের ঘোষণা আসতে পারে,” বেনারকে বলেন তিনি। 

“আমার মনে হয় না এই সফরে নতুন কোনো বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে,” বেনারকে বলেন নয়াদিল্লীর অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো, জয়িতা ভট্টাচার্য। 

এই সফরে “সাধারণ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়নের ওপর,” নজর থাকবে জানিয়ে ওই গবেষক বলেন “বহুল বিতর্কিত তিস্তা জলবণ্টনের মতো বিষয় নিয়ে এই সফরে কী হবে” তা নিশ্চিত নয়। 

বছরের শুরুতেই ঢাকা এবং দিল্লির মধ্যে মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতি, ধরলা এবং দুধকুমার—এই ছয়টি নদীর জলবণ্টন সংক্রান্ত আলোচনা হয়ে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে জল ভাগাভাগির ওপর যত না নজর, তার চেয়ে বেশি নজর জলের ব্যবস্থাপনার ওপর, সেটা পরিষ্কার।” 

করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন নেবার পর বাংলাদেশেই মোদির প্রথম বিদেশ সফর হলেও ভারতের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য প্রমিত পাল চৌধুরীর মতে, নীতির দিক থেকে মোদির এই সফর “খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে আমি মনে করি না।” 

“ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই কিঞ্চিৎ জটিল, তবে সেই জট অনেকটাই শিথিল হয়েছে গত কয়েক বছরে মোদি-হাসিনার পারস্পরিক বোঝাপড়ার ফলে,” বেনারকে বলেন এই এই পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ। 

যদিও সেই সম্পর্ক এখনো “তিস্তার জল নিয়ে বিতর্কের অবসান” ঘটাতে পারেনি। 

তিস্তা নদীর পানি বণ্টন বিষয়ে ১৯৫১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করে। বাংলাদেশ সময়কালে ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা একটি বণ্টন পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

সেই অনুসারে ভারতের জন্য ৪২ দশমিক পাঁচ ভাগ এবং বাংলাদেশের জন্য ৩৭ দশমিক পাঁচ ভাগ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়। বাকি পানি নদীর স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য রাখার কথা বলা হয়।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে পানি বণ্টনের এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। তবে এই সফরের আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সফর থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। 

এর ফলে ওই চুক্তি হয়নি। ভারতের আইন অনুযায়ী নদীর পানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের হাতে।

পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য তাঁর সরকার কাজ করছে বলে নরেন্দ্র মোদি ২০১৯ সালের অক্টোবরে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের সময় তাঁকে অবহিত করেন।

তবে এখন পর্যন্ত কার্যত তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। 

_63I2172.JPG
নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতাকারীদের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হামলা চালায় প্রতিপক্ষের ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা। ২৩ মার্চ ২০২১। [সাবরিনা ইয়াসমীন/বেনারনিউজ]

ঢাকায় মোদির সফর 

সফরসূচি অনুসারে, নরেন্দ্র মোদির গোপালগঞ্জের সংখ্যালঘু মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি মন্দির এবং সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের ইশ্বরীপুরে যশোরেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনের কথা রয়েছে। 

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদাত আলী বেনারকে বলেন, ২৭ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারত পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি থেকে সরাসরি ঢাকায় নতুন যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর ঘোষণা করবেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

“কোভিড-১৯ পরিস্থিতির উন্নতির পরে এই রুটে যাত্রী পরিষেবা শুরু হবে,” বলেন তিনি। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। 

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশের গেরিলাদের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল। 

ঢাকা এবং দিল্লি যৌথভাবে এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান করতে সম্মত হয়। এই অনুষ্ঠান উপলক্ষেই বাংলাদেশ আসছেন মোদি। 

বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রী রাধা দত্তের মতে, দুই দেশের মধ্যে “সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদান–প্রদান” বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মোদির এই সফর অনেকটা ‘সোশ্যাল ভিজিট’ হলেও “বাংলাদেশের এই বিশেষ মুহূর্তে মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো ভারতের পক্ষেও গর্বের।” 

“কারণ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দীর্ঘদিন মেলেনি,” বেনারকে বলেন রাধা দত্ত। 

তাঁর মতে, সেই স্বীকৃতি এসেছে ২০০৫ সালের পর, যখন হাসিনা খোলাখুলিভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন ভারতের কাছে, মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনের জন্য শুধু নয়, শেখ মুজিবকে সমর্থন করার জন্যও। 

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২০২০ সালের গান্ধী শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করায় ভারতকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ। 

সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, জাতির জনককে সম্মানজনক এই পুরস্কারে ভূষিত করাটা বাংলাদেশ ও তার জনগণের জন্য সম্মানের। 

নরেন্দ্র মোদি সর্বশেষ ২০১৫ সালের জুনে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত বছরের মার্চে তাঁর ঢাকা সফরের কথা ছিল। 

তখনো কট্টরপন্থী ইসলামি দলগুলো মোদির সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিল। পরে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ওই অনুষ্ঠান ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর বাতিল হয়। 

প্রায় এক বছর পর এবার যখন একই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে, তখন বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। এরই মধ্যে চলছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে দশ দিনের অনুষ্ঠানমালা এবং বিলম্বে শুরু হওয়া একুশের বইমেলা। 

মঙ্গলবার বাংলাদেশে পাঁচ হাজার ৫৫৪ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা গত বছরের ২ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন